মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে রাজি করানোর লক্ষ্যে নতুন করে ‘অর্থনৈতিক আক্রমণ’ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় তেহরান মার্কিন কোম্পানিগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজায়ি স্পষ্ট করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো যদি ট্রাম্পের এই ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ অংশীদার হয়, তবে তাদেরও ‘শত্রু’ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তাদের স্বার্থে আঘাত হানা হবে।
গত বুধবার (১৯ আগস্ট) ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে, ইরানকে ‘অভূতপূর্ব মাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার’ সম্মুখীন হতে হবে। এর ধারাবাহিকতায় শনিবার (২২ আগস্ট) রেজায়ি জানান, চলমান পরিস্থিতিতে ইরানের হাতে চাপ প্রয়োগের আরও কৌশল অবশিষ্ট রয়েছে। তিনি দাবি করেন, এখন পর্যন্ত ইরান কেবল সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে, কিন্তু মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থে এখনো কোনো আঘাত করা হয়নি। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, যদি তাদের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, তবে ইরানের আশপাশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হবে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ‘ভূমিকম্পের মতো’ রূপ নেবে বলে রেজায়ি সতর্ক করেছেন। কয়েক মাসের মধ্যে এই প্রথম তেহরান সরাসরি মার্কিন ও পশ্চিমা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার হুমকি দিল এবং প্রথমবারের মতো তেল কোম্পানিগুলোকে স্পষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল ইরান। এছাড়া গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানেও হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
দ্য টেলিগ্রাফের তথ্য অনুযায়ী, ইরান সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা সাইবার হামলার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চার দিন অচল করে রেখেছিল। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তেহরানের বিরুদ্ধে ‘এ যাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, সোমবার তিনি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোরতম নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত ঘোষণা করবেন।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিনিয়োগ ও ব্যবসার ব্যাপক বিস্তারের কারণে এই হুমকি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, যুদ্ধ শেষ হলে হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত হবে এবং তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই এলাকাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করে ছবিও পোস্ট করেছেন।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, যারা মার্কিন সামরিক বিমান ও জ্বালানি ট্যাংকারকে আশ্রয় দিচ্ছে, তারা যেন হামলার শিকার হলে অভিযোগ না করে। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও উপসাগরীয় দেশগুলোকে মার্কিন পদক্ষেপ ঠেকাতে ট্রাম্পকে পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান শনিবার দাবি করেছেন, বিশ্ব ইতিমধ্যে তেহরানের ‘বিজয় মেনে নিয়েছে’ এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন ব্যাপকভাবে ‘ঘৃণা’র পাত্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে সামরিকভাবে কাবু করতে ব্যর্থ হয়ে ট্রাম্প এখন অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে নতি স্বীকার করানোর চেষ্টা করছেন। তবে দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখেও ইরান যে নতি স্বীকার করেনি, তা ট্রাম্পের এই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানকে ‘যেকোনো ধরনের সহায়তা’ দেওয়া দেশগুলোকে ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির’ মুখে পড়তে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দ্য টেলিগ্রাফ গত সপ্তাহে জানিয়েছিল, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে কথা বলার পর ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনার বাইরে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অনেকটাই এড়িয়ে চলেছে তেহরান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর মধ্যে কাতারের রাস লাফান এলএনজি কেন্দ্র এবং সৌদি আরবের আরামকোর স্থাপনাও রয়েছে।



