নিজেদের পছন্দের সংবাদমাধ্যম চায় হোয়াইট হাউস: নিষিদ্ধ তিন গণমাধ্যম

, বিশ্ব

নিজেদের পছন্দের সংবাদমাধ্যম চায় হোয়াইট হাউস: নিষিদ্ধ তিন গণমাধ্যম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা ব্যবহারের নতুন এক নজির সৃষ্টি হলো হোয়াইট হাউসে। শনিবার সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাঁর প্রশাসন। ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক থাকা এই গণমাধ্যমগুলোর ওপর আরোপিত নতুন এই বিধিনিষেধ রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষক ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, রাজনৈতিক সংকট বা জনমনে তৈরি হওয়া ক্ষোভ থেকে মনোযোগ সরাতেই ট্রাম্প এমন কৌশল বেছে নিয়েছেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের উপপ্রেস সচিব সারাহ ম্যাথুস বলেন, ভয় দেখিয়ে এবং ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। পুরো রিপাবলিকান পার্টিকে নিজের সামনে নতিস্বীকার করানোর পর এখন তিনি সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

এদিকে নিজের পছন্দের বাইরের সংবাদ পরিবেশনের শাস্তি হিসেবেই এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদি গণমাধ্যমগুলো তাঁর ইচ্ছামতো ইতিবাচক খবর প্রচার করে, তবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হতে পারে। প্রেসিডেন্ট বলেন, যে দেশ নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশের সুযোগ দেয়, সেখানে সমস্যা রয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, জনস্বার্থের জায়গা থেকে তিনি এসব গণমাধ্যমকে ঢুকতে দিতে বাধ্য নন।

সংবিধানবিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে স্পষ্টভাবে অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালারড পিপলের (এনএএসিপি) সভাপতি ডেরিক জনসনের মতে, ট্রাম্প সত্য আড়াল করতে চান। পেট্রলের উচ্চমূল্য, অর্থনীতিতে ধীরগতি এবং এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথির মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো থেকে দৃষ্টি সরাতেই তিনি সংবাদমাধ্যমকে নিশানা করছেন।

ট্রাম্পের এমন আক্রমণাত্মক কৌশলের পেছনে তাঁর দীর্ঘদিনের হতাশা কাজ করছে বলে মত বিশ্লেষকদের। এর আগে কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টস ভবনে নিজের নাম খোদাই করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু আদালত তা আটকে দেন। এরপরই ওই ভবনের ২৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সংস্কার প্রকল্প বাতিলের হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি ফেড চেয়ারম্যানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেও সুদের হারের বিষয়ে নিজের পছন্দ বাস্তবায়ন করতে পারেননি ট্রাম্প।

বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের কঠোরতার বহিঃপ্রকাশ শুধু সংবাদমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নেই। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন স্বাধীন সংবাদপত্র ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর শীর্ষ কর্তাদের চাকরিচ্যুত করেছে। এছাড়া সরকারি বেতার ও টেলিভিশনের অর্থায়ন বন্ধ এবং অনলাইন নজরদারিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে তাঁর প্রশাসন। ট্রাম্পের সমালোচনা করে সংবাদ প্রচার করায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল বা উদারপন্থী সংগঠনগুলোর করসুবিধা কেড়ে নেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডগলাস হাই, যিনি রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির সাবেক যোগাযোগ পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন, মনে করেন ট্রাম্পের এই রাগ এখন স্পষ্টতই আক্রমণাত্মক আচরণে রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, রিপাবলিকানরা চায় ট্রাম্প অর্থনৈতিক উদ্বেগগুলো নিয়ে কাজ করুন, কিন্তু তিনি সংবাদমাধ্যমের আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ করতেই বেশি ব্যস্ত। নির্বাচনের ৪৫ দিন আগে ট্রাম্পের এই কৌশল দলের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না বলেই মনে করেন হাই।

একের পর এক আইনি ও প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়ে ট্রাম্প এখন নিজের অনুগতদের নিয়ে হোয়াইট হাউসকে ঘিরে রেখেছেন। যদিও সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প দেশের প্রকৃত সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হচ্ছেন। তবুও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চীনের সঙ্গে লেনদেনের মতো বিষয় বা ইসরায়েলকে পাঠানো ৬০ হাজার বোমার মতো সংবেদনশীল অস্ত্র নিয়েও মার্কিন রাজনীতির অন্দরমহলে উত্তেজনা চলছে।

সব মিলিয়ে নিজের ক্ষমতার দাপট দেখানোর এই লড়াইয়ে ট্রাম্প যেন একরোখা পথে হাঁটছেন। তবে তাঁর এই কৌশল যে ভোটারদের উদ্বেগ দূর করতে পারছে না, তা জরিপেই স্পষ্ট। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত নতুন কোনো মন্তব্য পাওয়া না গেলেও, পরিস্থিতি যে আরও জটিল হচ্ছে তা পরিষ্কার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সুদের হার কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) ওপরও তিনি প্রচণ্ড চাপ দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ জন্য তিনি অস্বাভাবিক সব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। চাকরির আরও তথ্য: কিন্তু তাঁর নিজের পছন্দে নিয়োগ পাওয়া ফেড চেয়ারম্যানও তাঁর কথা রাখেননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বরং অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনিও ঋণের খরচ বাড়ানোর পক্ষে ভোট দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারপরও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে খুবই অজনপ্রিয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশটির মানুষ অর্থনীতি ও পেট্রলের চড়া দাম নিয়েও উদ্বিগ্ন রয়েছেন।