দেড় দশকে অর্ধেক টিলা হারিয়ে বিবর্ণ সিলেট

, বাংলাদেশ

দেড় দশকে অর্ধেক টিলা হারিয়ে বিবর্ণ সিলেট

সিলেটের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে উঁচু-নিচু টিলা, পাহাড় ও সমতল ভূমির অপূর্ব সমন্বয়। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন প্রকল্প এবং অবৈধ দখলদারিত্বের কবলে পড়ে পর্যটকদের প্রিয় এই জনপদ তার চিরচেনা রূপ হারাচ্ছে। সবুজে ঢাকা এসব টিলা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়, বরং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। অথচ উন্নয়নের নামে নির্বিচারে টিলা কাটার ফলে সিলেট আজ তার সেই ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য হারিয়ে বিবর্ণ হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) তথ্যমতে, ২০০৯ সালে সিলেটের ছয়টি উপজেলা ও মহানগর এলাকায় টিলার সংখ্যা ছিল এক হাজার ২৫টি। বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৫৬৫টি। অর্থাৎ মাত্র দেড় দশকের ব্যবধানে এলাকাটি থেকে ৪৬০টি টিলা চিরতরে হারিয়ে গেছে। শতাংশের হিসেবে সিলেটের প্রায় ৪৫ শতাংশ টিলা ধ্বংস হয়ে গেছে। সিলেট নগরীর বালুচর, মেজরটিলা, আখালিয়া, হালদারপাড়া ও খাদিমনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় একসময় সবুজের আবরণ জড়ানো অসংখ্য ছোট-বড় টিলা দৃশ্যমান থাকলেও, আজ সেখানে বসতবাড়ি, প্লট বা অন্যান্য স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির পাশাপাশি সরকারি ও খাস জমির টিলাগুলোও রেহাই পাচ্ছে না। নগর সম্প্রসারণের চাহিদাকে পুঁজি করে টিলা কেটে সমতল করার প্রবণতা বাড়ছে। ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নগর ও আশপাশের এলাকায় আবাসন প্রকল্পের নামে নির্বিচারে টিলা নিধন চলছে। প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, অভিযোগ পাওয়ার পর তারা অভিযান চালিয়ে জড়িতদের জেল-জরিমানা করছেন। তবে বাস্তবের চিত্র ভিন্ন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইন ও আদালতের নির্দেশনা থাকলেও টিলা রক্ষায় এর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। বেলার সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আক্তার জানান, ২০১২ সালের ১ মার্চ হাইকোর্ট টিলা কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং টিলা সংরক্ষণের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও আদালত নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু সেই নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় টিলা নিধন পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

টিলা কাটার এই ভয়াবহ পরিণতির অন্যতম নজির হলো ভূমিধসের ঝুঁকি। টিলার পাদদেশে বসতি স্থাপন করার ফলে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও মাটির ক্ষয়ের কারণে দুর্ঘটনার মাত্রা বাড়ছে। বেলার তথ্যানুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নয় বছরে সিলেটে টিলা ধসের ঘটনায় ৫১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও মামলাভুক্ত টিলাগুলোতে সাইনবোর্ড টাঙানো, নিয়মিত নজরদারি এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।

বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান মনে করেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কেবল পরিবেশ অধিদপ্তর বা একক কোনো সংস্থার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। তিনি সকল পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, সিলেট মহানগর ও সদর এলাকায় ১৯৯টি, গোয়াইনঘাটে ৪৪টি, কোম্পানীগঞ্জে একটি, বিয়ানীবাজারে ২৭০টি, গোলাপগঞ্জে ৪১৩টি এবং জৈন্তাপুরে ৯৮টি টিলার অস্তিত্ব রয়েছে। এছাড়া কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমা এলাকাতেও টিলার উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়।

প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই সম্পদ একবার হারিয়ে গেলে তা আর পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তাই অবশিষ্ট টিলাগুলো টিকিয়ে রাখা এবং অবৈধ দখল বন্ধ করা সিলেটের পরিবেশ রক্ষার জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালতের নির্দেশনা কার্যকর করা এবং টিলার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণই পারে সিলেটের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও মানুষের নিরাপত্তা বজায় রাখতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অবৈধভাবে টিলা কাটা, পাথর লুট ও আবাসন এলাকা গড়ে তুলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে খ্যাত পর্যটকদের আকর্ষণীয় সিলেটকে বিবর্ণ করে ফেলা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংখ্যার হিসাবে প্রায় ৪৫ শতাংশ টিলা আর নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোথাও ছিল বসতি, কোথাও ছিল ফাঁকা জায়গা কিংবা প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাশাপাশি যেসব টিলা কাটা হয়েছে, সেসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সিলেটে অতীতে টিলাধসে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বেলা জানায়, ২০১২-২০২১ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে সিলেটে টিলা ধসে ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এছাড়া কানাইঘাট ও ফেঞ্চুগঞ্জে টিলাভূমির পরিমাণও উল্লেখ করা হয়েছে।