ছাত্র আন্দোলনের চাপে পদত্যাগ করলেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ভুচিচ

, বিশ্ব

ছাত্র আন্দোলনের চাপে পদত্যাগ করলেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ভুচিচ

প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা প্রবল ছাত্র আন্দোলন ও দুর্নীতির অভিযোগে চাপের মুখে পদত্যাগ করেছেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুচিচ। রাজধানী বেলগ্রেডে নিজ বাসভবনের বাইরে সমর্থকদের সামনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। দীর্ঘ নয় বছরের শাসনকালে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দাবি করেন এই নেতা। তবে সংবিধান অনুযায়ী তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে না পারায়, আসন্ন সংসদ নির্বাচনে নিজের দল প্রোগ্রেসিভ পার্টির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

ভুচিচ সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের একটি বড় কারণ ছিল ২০২৪ সালের নভি সাদ রেলস্টেশন দুর্ঘটনা। সেই দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত হওয়ার পর অভিযোগ ওঠে যে, নির্মাণকাজের সময় খরচ কমাতে অনিয়ম করা হয়েছিল। স্টেশনটির সংস্কারের সঙ্গে ভুচিচ নিজেকে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়েছিলেন এবং এটিকে দেশের অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু দুর্ঘটনাটি তার দলের দীর্ঘ এক যুগের ব্যর্থতার প্রতিফলন হিসেবে জনমনে গেঁথে যায়। রাশিয়াপন্থী এই জনতুষ্টিবাদী নেতার সরকার শুরু থেকেই ক্ষোভের মুখে ছিল। অভিযোগ ছিল, নির্মাণকাজে নিয়ম না মেনে খরচ কমানো হয়েছে। ২০২৪ সালে নভি সাদ রেলস্টেশনের ছাদ ভেঙে পড়ে। এই ঘটনাই প্রথম সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ উসকে দেয়।

আন্দোলনটি কেবল ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এতে শিক্ষক, শ্রমিক ও কৃষকরাও শামিল হন। সার্বিয়ার টেনিস তারকা নোভাক জকোভিচ এই আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছিলেন, যার ফলে তাকে এক প্রকার দেশত্যাগে বাধ্য হতে হয়। গ্রীষ্মজুড়ে চলা এই বিক্ষোভে পুলিশের নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও এর মধ্যে ভুচিচের অনেক কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল সরকারের পরিবর্তন এবং আগাম নির্বাচনের আয়োজন করা। তবে ইতিহাসের সেরা এই টেনিস কিংবদন্তিকে শেষমেশ এই সমর্থনের কারণে দেশ ছাড়তে হয়। ভুচিচের অধীনে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা একে একে পদত্যাগ করেন। পুলিশের নির্যাতনের অভিযোগের পর বিক্ষোভ অশান্ত হয়ে ওঠে।

আন্দোলনের মুখে চাপের চাপে পড়ে এ বছরই দুইবার ভোটের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছেন ভুচিচ। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী পদত্যাগের তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তিনি জানান, অক্টোবরের শেষ দিকে সংসদীয় ভোট হবে এবং তার এক মাসেরও বেশি সময় পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আপাতত সংসদ স্পিকার আনা ব্রনাবিচ অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন, যিনি প্রোগ্রেসিভ পার্টিরই সদস্য। জুন মাসেই তিনি পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন।

ক্ষমতা ছাড়ার আগে ভুচিচ ৪৯ জনকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন, যাদের মধ্যে ২৩ জন শিক্ষার্থী ও তার দলের অনুগত ব্যক্তি রয়েছেন। গত দেড় বছরের অস্থির পরিস্থিতির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন অপরাধের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছিল। এই ঘটনাগুলোকে তিনি একটি কঠিন সময় হিসেবে অভিহিত করেছেন। এদিকে, আসন্ন নির্বাচনে ভুচিচের দলের মুখোমুখি হবে ‘স্টুডেন্টস উইন’ নামক একটি দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং পশ্চিমাপন্থী বিরোধী জোট ‘ইউরোপীয় সার্বিয়া’।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন আলেক্সান্দার ভুচিচ। তিনি প্রকাশ্যে সার্বিয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও, একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার ভবিষ্যৎ এখন আসন্ন সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে, যেখানে তিনি পুনরায় ক্ষমতার কেন্দ্রে ফেরার লড়াইয়ে নামছেন।