ইউক্রেনের দক্ষিণ অঞ্চলের খেরসন প্রদেশের ওলেশকি শহরটি এখন এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে শহরটি রুশ বাহিনীর দখলে রয়েছে। ডিনিপ্রো নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এই জনপদটি এখন কার্যত অবরুদ্ধ এবং খাদ্য, পানি, ওষুধ ও বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে বাসিন্দারা। যুদ্ধের আগে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের প্রাণচঞ্চল এই শহরে বর্তমানে মাত্র ২ হাজার বেসামরিক মানুষ টিকে আছেন, যার মধ্যে ৫০টি শিশু রয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। যুদ্ধের কারণে তার নিজের বাড়ি ও যেখানে গত শীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই বাড়িটিও ধ্বংস হয়েছে।
খাদ্য সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়রা বেঁচে থাকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মে মাস থেকে শহরে নতুন করে কোনো খাদ্য সরবরাহ পৌঁছায়নি। সেখানকার এক নারী জানিয়েছেন, তীব্র পুষ্টিহীনতায় তার ওজন ১১০ কেজি থেকে কমে ৬৭ কেজিতে নেমে এসেছে। খাবারের অভাবে অনেকে এখন বাগান থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন ধরণের আগাছা রান্না করে খাচ্ছেন। এমনকি স্থানীয় যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপগুলোতে কোন আগাছা ভোজ্য এবং তা কীভাবে রান্না করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। তিনি জানান, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার না পেলে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, শহরে শেষ খাদ্য সরবরাহ মে মাসে পৌঁছেছিল।
শহরে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কেন্দ্রীয় পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। ২০২৩ সালে কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের ফলে সৃষ্ট বন্যায় শহরের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে। খাবারের সন্ধানে বাইরে যাওয়ার পথগুলোও অত্যন্ত বিপজ্জনক। ২০ সেপ্টেম্বর পাশের এলাকা থেকে খাবার নিয়ে ফেরার পথে ড্রোন হামলায় এক দম্পতি নিহত হওয়ার পর বাসিন্দারা ভয়ে ঘরের বাইরে বের হতে সাহস পাচ্ছেন না। এলাকা জুড়ে মাইন ও ড্রোনের উপস্থিতিকে বাসিন্দারা বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। এরপর থেকে শহরের স্বাভাবিক জীবন আর ফিরতে পারেনি। এক স্থানীয় নারী জানিয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর এক দম্পতি ওলেশকি থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরের রাদেনস্ক এলাকায় খাবার আনতে গিয়েছিলেন।
মৃত ব্যক্তিদের দাফন নিয়েও তৈরি হয়েছে এক করুণ চিত্র। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালের মর্গে অনেক মরদেহ দীর্ঘ সময় পড়ে থাকছে। কিছু ক্ষেত্রে রাস্তার ওপর মরদেহ পড়ে থাকারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও স্থানীয়রা জানিয়েছে পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। জাতিসংঘ মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন জানিয়েছে, চলতি বছর ওলেশকি ও এর পার্শ্ববর্তী হোলা প্রিস্তান এলাকায় অন্তত ২৯ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৫৪ জন আহত হয়েছেন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা গত ২৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি জানান, সহায়তার অভাবে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি জাতিসংঘ ও রেডক্রসসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাকে দ্রুত এবং বাধাহীনভাবে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ওদিকে, ইউরোপ কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার মাইকেল ও’ফ্লাহার্টিও বেসামরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
এই সংকটের দায় নিয়ে দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছে। ইউক্রেন রাশিয়ার দখলদারিত্বকে দায়ী করলেও, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ইউক্রেনীয় বাহিনীর হামলাকেই খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের প্রতিবন্ধক বলে দাবি করেছেন। তবে সংকট মোকাবিলায় রাশিয়ার সেনারা কাজ করছে বলে ২১ সেপ্টেম্বর তিনি মন্তব্য করেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউক্রেনীয় বাহিনী ড্রোনের মাধ্যমে সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। খেরসন আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ সেপ্টেম্বর প্রায় চার টন খাবার ১০০টি নির্ধারিত স্থানে ড্রোনের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে এই সাহায্য কতটুকু কার্যকরভাবে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাচ্ছে বা এর কতটা রুশ বাহিনী আটক করছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। যুদ্ধের কবলে পড়ে ওলেশকির বাসিন্দারা একদিকে ক্ষুধা ও চিকিৎসার অভাব, অন্যদিকে মাইন ও ড্রোন হামলার ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।



