জাতীয় চিড়িয়াখানার হ্রদে নৌকাভ্রমণ: অব্যবহৃত জেটি ও নৌকার বোঝা

, বাংলাদেশ

জাতীয় চিড়িয়াখানার হ্রদে নৌকাভ্রমণ: অব্যবহৃত জেটি ও নৌকার বোঝা

রাজধানীর মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানার ৩২ একরের দক্ষিণ হ্রদে নৌকাভ্রমণের জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেও প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। কর্তৃপক্ষ গত জুনের মধ্যে ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে জেটি, সংযোগ সড়ক ও যাত্রীছাউনি নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। এছাড়া, ভ্রমণ কার্যক্রমের জন্য ১৭ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে দুটি নৌকা। অথচ কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও ইঞ্জিনের তীব্র শব্দের কারণে নৌকাভ্রমণ চালু করা সম্ভব হয়নি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জেটি, অ্যাপ্রোচ রোড ও যাত্রীছাউনি নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে গত জুনে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে চারটি চিতা বাঘ কেন এল না।

জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মো. শাহিনুর আলম জানিয়েছেন, বর্তমানে কেনা নৌকাগুলোর ইঞ্জিনে অতিরিক্ত শব্দ হয়, যা চিড়িয়াখানার প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। মূলত প্রাণীদের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করেই এ প্রকল্প আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এখন শব্দহীন ইঞ্জিন বা কম শব্দ হয় এমন ইঞ্জিনের বিকল্প খুঁজছে। তবে এ ধরনের ইঞ্জিন সহজে পাওয়া না যাওয়ায় প্রকল্পটি কবে নাগাদ চালু হবে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত কিছু বলতে পারছে না। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, নৌকার ইঞ্জিন বেশি শব্দ করায় এই কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে বেশ কিছু জায়গায় এমন ইঞ্জিনের খোঁজ করে পাওয়া যায়নি।

প্রকল্পটির আর্থিক অনুমোদনের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, গত ১৪ মে অর্থ মন্ত্রণালয় নৌকাভ্রমণ চালুর বিষয়ে ছাড়পত্র দেয়। প্রাথমিকভাবে প্রতিটি নৌকায় ২০ জন যাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনা রয়েছে। জনপ্রতি ভ্রমণের টিকিট মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের চিন্তা করা হচ্ছে। যদিও দক্ষিণ হ্রদে নৌকাভ্রমণ শুরুর পরিকল্পনা চূড়ান্ত, কিন্তু উত্তর হ্রদে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কারণ সেখানে দুটি পেলিকান পাখি বসবাস করে, যেগুলোর নিরাপত্তার স্বার্থে ওই হ্রদে নৌকা চালানো হবে না। পাশাপাশি তেল পানিকে দূষিত করবে না, সেটাও দেখা হচ্ছে।

চিড়িয়াখানার অবকাঠামো অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে হ্রদগুলো খনন করা হয়। মূল ফটক থেকে শিশুপার্কের বিপরীত দিকে অবস্থিত এই দক্ষিণ হ্রদটি এখন জেটি ও যাত্রীছাউনি নির্মাণের ফলে দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর সরেজমিন দেখা গেছে, জেটির কাছেই সাদা রঙের নৌকা দুটি বাঁশের খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬ দশমিক ৬৩ একর আয়তনের চিড়িয়াখানাটি ১৯৭৪ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

এদিকে, চিড়িয়াখানায় নৌকাভ্রমণের এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রাণিবিদেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান এই প্রকল্পটিকে অজ্ঞতা প্রসূত অভিহিত করে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এর ফলে হ্রদ এলাকায় মানুষের ভিড় ও কোলাহল বাড়বে, যা খাঁচায় বন্দি থাকা প্রাণীগুলোর জন্য ভীতি ও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

অধ্যাপক ফিরোজ জামান আরও উল্লেখ করেন যে, জাতীয় চিড়িয়াখানার এই হ্রদ এলাকা একসময় পরিযায়ী পাখির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র ছিল। জেটি নির্মাণ ও নৌকার ব্যবহারের ফলে সেই পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর মতে, নৌকার হর্ন ও ইঞ্জিনের শব্দ পরিযায়ী পাখিদের এখানে আসা থেকে নিরুৎসাহিত করবে। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, নৌকাভ্রমণের পরিবর্তে এ স্থানটিকে কালিম ও ডাহুকের মতো জলজ পশুপাখির প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলা যেত। শব্দ ও পানিদূষণ করা ছাড়া কীভাবে নৌকাভ্রমণের আয়োজন করা যায়, তারা সে চেষ্টা করছে।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, বিনিয়োগ করা অর্থ ও অবকাঠামো ঠিক রেখে কীভাবে প্রাণীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। একদিকে উচ্চমূল্যের সরঞ্জাম অব্যবহৃত পড়ে আছে, অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ মহলের আপত্তির কারণে প্রকল্পটি পরিবেশগত ও প্রাণিবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।