হকার উচ্ছেদ নয়, ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় চাই টেকসই পরিকল্পনা

, বাংলাদেশ

হকার উচ্ছেদ নয়, ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় চাই টেকসই পরিকল্পনা

রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাট ও ফুটপাত যেভাবে হকারদের দখলে চলে গেছে, তাতে শহরে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যানজট ও বিশৃঙ্খলা নিরসনে এই সমস্যার সমাধান অত্যন্ত জরুরি, কারণ বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, যেখানে ফুটপাত ও রাস্তা সম্পূর্ণ দখলে থাকায় নিত্যদিন মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। জনদুর্ভোগ কমাতে গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকা অবৈধ দখলমুক্ত করা সময়ের দাবি। সুনির্দিষ্টভাবে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরকে বিবেচনায় নিলেও বলতে হয়, হকাররা সেখানে যেভাবে ফুটপাত ও রাস্তায় তাদের দখলদারি কায়েম করেছে, যান চলাচলে যে অচলাবস্থা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে এবং এর জন্য জনগণকে প্রতিদিন যে ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে, তার অবসান দরকার। গোলচত্বরটিসহ চারদিকের রাস্তাগুলো অবৈধ স্থাপনামুক্ত করা জরুরি। ‘অবৈধ’ বলে হকার উচ্ছেদের যৌক্তিকতা কতটুকু।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি কতটা যৌক্তিক ও পরিকল্পিত? গত বুধবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পরিচালিত অভিযান আবারও সেই পুরোনো কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, এ ধরনের বিচ্ছিন্ন অভিযান খুব একটা সুফল বয়ে আনে না। এক্সকাভেটর দিয়ে অবৈধ স্থাপনা ভাঙার সময় দোকানে আগুন লাগার ঘটনায় হকারদের সঙ্গে পুলিশ ও সিটি করপোরেশন কর্মীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় তিনটি সিটি করপোরেশনের গাড়ি ও কিছু দোকান ভস্মীভূত হয়, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর হয় এবং গণমাধ্যমকর্মীরাও হামলার শিকার হন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে কাজটি হবে। তারপরও এক্সকাভেটর দিয়ে অবৈধ স্থাপনা ভাঙতে গিয়ে দোকানে আগুন না লাগলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ না–ও হতে পারত।

দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এ ধরনের সংঘর্ষের কারণে এলাকাটিতে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। হকারদের তুলনায় পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। সবচেয়ে বড় দুঃখজনক বিষয় হলো, দিনশেষে সাধারণ মানুষ এই তীব্র গরমে রাস্তায় আটকে পড়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহায়। কারওয়ান বাজার বা গুলিস্তানের মতো এলাকায় সাম্প্রতিক অতীতে একই ধরণের উচ্ছেদ অভিযানের পর দেখা গেছে, অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় দোকান বসেছে। তাই এগুলোকে উচ্ছেদ অভিযান না বলে অনেকটা ‘উচ্ছেদ-উচ্ছেদ খেলা’ বলা চলে। হকাররা এ ধরনের অভিযানের বিরোধিতা করবে, এটাই স্বাভাবিক।

ফুটপাত দখলদারিত্বের শিকড় অনেক গভীরে। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় এই দখলদারিত্বের একটি বিস্তৃত ও শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে। এই অবৈধ ব্যবসার অর্থ বিভিন্ন স্তরে পৌঁছায়। শুধুমাত্র পুলিশ দিয়ে অভিযান চালিয়ে বা বুলডোজার দিয়ে দোকান ভাঙলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর সঙ্গে জড়িত লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

শুরুতেই ঢাকা শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি মোড় চিহ্নিত করে সেখান থেকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে দুটি মোড়কে ছয় মাসের জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা যেতে পারে। ফুটপাতের প্রশস্ততা যাচাই করে দোকানের সীমানা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। যেখানে ফুটপাত সংকীর্ণ, সেখানে কোনো দোকান বসতে দেওয়া যাবে না। এ কাজে নগর-পরিকল্পনাবিদদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সফল হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মোড়ে এই মডেল কার্যকর করা সম্ভব। শুরুতেই এই ডিসক্লেইমার দিচ্ছি বা এটা পরিষ্কার করে নিচ্ছি যে ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট হকাররা যেভাবে দখল করে নিয়েছে, তা শহরটিতে নৈরাজ্য তৈরি করেছে এবং এর বিহিত, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা দরকার।

মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোকে ঘিরেও একই পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। যাত্রী সাধারণের যাতায়াতের সুবিধার জন্য উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রতিটি স্টেশনের নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত এলাকা হকারমুক্ত রাখা একান্ত প্রয়োজন। উচ্ছেদ নয়, বরং নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই নৈরাজ্য নিরসন করতে হবে।

যেকোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধারাবাহিক তদারকি ও জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। মিরপুর ১০ নম্বরের মতো এলাকায় যদি নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে দোকান বসতে না দেওয়ার কঠোর নিশ্চয়তা দেওয়া যেত, তবে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের ঝুঁকি কমত। এখানে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে প্রকৃত হকারদের পুনর্বাসন বা সুশৃঙ্খলভাবে বসতে দেওয়া। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই কঠিন কাজটিও সম্পাদন করা অসম্ভব নয়।