বাংলার ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক রাজনীতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বিশেষত, বাংলার ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যা ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ হিসেবে পরিচিত। এই দুর্ভিক্ষের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ইংরেজ ব্যবসায়ীদের লোভী মজুতদারি প্রথা। সুপ্রকাশ রায়ের তথ্য অনুযায়ী, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়ীরা বাংলা ও বিহারের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য কেন্দ্র খুলে চাউলের একচেটিয়া বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। তারা ১৭৬৯ সালে ফসল ওঠার পর পুরো মজুত নিজেদের দখলে নেয় এবং ১৭৭০ সালে চড়া দামে তা বাজারে ছাড়ে। ফলে খাজনার দায়ে নিঃস্ব কৃষক চাউল কিনতে ব্যর্থ হয়ে চরম সংকটে পড়ে এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ১৭। এমতাবস্থায়, ‘ইহারা ১৭৬৯ খৃষ্টাব্দে ফসল উঠিবার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা ও বিহারের সমগ্র ফসল ক্রয় করিয়া সারা বৎসর মজুত করিয়া রাখে এবং ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে কয়েকগুণ বেশি দামে তাহা বিক্রয় করিতে আরম্ভ করে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের দোহাই দিয়ে এই দুর্ভিক্ষের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। জেমস মিলের মতো ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদরা ভারতের অন্যান্য প্রদেশের সাথে বাংলার তুলনা টেনে ইংরেজের দুঃশাসন ও লুণ্ঠনকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। বস্তুত, ভারতে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার বৈধতা প্রমাণের জন্য তারা তৎকালীন দেশি শাসকদের সম্পর্কে নেতিবাচক বয়ান তৈরির কৌশল অবলম্বন করেন। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়। এই শাসনকে সুসংহত করতে তারা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার (১৭৩৩-১৭৫৭) বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যার আশ্রয় নেন। স্পষ্টতই, ভারতের ‘বিভিন্ন প্রদেশে প্রায়শই সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগে’র ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে, বাংলায় সংঘটিত এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ইংরেজের দায় ধামাচাপা দেয়ার বস্তুনিষ্ঠ সুযোগ নেই। আমরা আগেই বলেছি, কোনো অঞ্চলে ঔপনিবেশিক আগ্রাসন, দখলদারত্ব ও শাসনব্যবস্থার ‘ন্যায্যতা’ সৃষ্টির জন্য, যেকোনো ঔপনিবেশিক শক্তিকে ভূতপূর্ব স্থানীয় শাসকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ও দখলদার ঔপনিবেশিক শক্তি সম্পর্কে ইতিবাচক বয়ান নির্মাণ ও প্রচার অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ফলে, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী ইতিহাসবিদ, রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা বরাবরই বাংলার দেশপ্রেমিক নবাব তরুণ সিরাজ-উদ-দৌলাকে (১৭৩৩-১৭৫৭) অন্যায্য অপবাদ আরোপের জন্য বেছে নিয়েছেন।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে নিয়ে জেমস মিলসহ ব্রিটিশ ইতিহাসবিদরা নানা কুৎসা রটিয়েছেন। মিল নবাবকে ‘ইন্দ্রিয়পরায়ণ’, ‘লোভী’, ‘নিষ্ঠুর’ ও ‘মনুষ্যত্বহীন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। জন সি মার্শম্যান ও ঈশ্বরচন্দ্র শর্মাও এই বয়ান দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র তার ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ গ্রন্থে দাবি করেন যে, সিরাজ ক্ষমতায় বসার পর থেকে কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি বা নারীর সতীত্ব নিরাপদ ছিল না। অথচ মাত্র ১৪ মাসের শাসনামলে তিন কোটি মানুষের বিশাল রাজ্যে এমন চরম অস্থিরতার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। বরং নতুন শাসক কর্তৃক পুরনো কর্মকর্তাদের সরিয়ে অনুগতদের নিয়োগ দেওয়া তৎকালীন রাজনৈতিক রীতি ছিল, যা সিরাজের ক্ষেত্রেও একইভাবে সত্য।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেনাপতি মীর জাফরকে অকৃতজ্ঞ ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, অথচ সিরাজের প্রতি অনুগত মীর মদন ও মোহন লাল ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও বিশ্বস্ত কর্মকর্তা। যদুনাথ সরকারও তাদের কর্মদক্ষতার প্রশংসা করেছেন। সুতরাং, সিরাজের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কোনো অবক্ষয় নয়, বরং রাজনৈতিক পরিপক্বতারই পরিচয় বহন করে। ঈশ্বরচন্দ্র মার্শম্যানের আউটলাইন অব দ্য হিস্ট্রি অব বেঙ্গল গ্রন্থের অনুবাদ করলেও, মূল ঐতিহাসিক তথ্যের যাচাইয়ের অভাব সেখানে স্পষ্ট। সুতরাং কপর্দকহীন কৃষকের ঘরে অন্নাভাবে হাহাকার উঠিল’।১৪২।
পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর সিরাজ-উদ-দৌলার জীবন ও যাত্রাপথ নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে, তা-ও অসত্য। প্রচলিত আছে যে, তিনি কোনো রক্ষিতাকে সঙ্গে নিয়ে গোপনে প্রাসাদের জানালা দিয়ে পালিয়েছিলেন। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সেই অনিশ্চিত যাত্রায় সিরাজ তাঁর বিশ্বস্ত পুরাতন রক্ষী এবং সহধর্মিণী বেগম লুৎফুন্নেসাকে (১৭৪০-১৭৯০) সঙ্গে নিয়েছিলেন। নিজের রাজ্য ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে সিরাজের এই যাত্রাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা ঔপনিবেশিক ইতিহাস রচনারই একটি অংশ মাত্র।



