শ্রেণিকক্ষে থাকার বয়সে ফ্রান্সের কিশোর-কিশোরীরা এখন রাজপথে। শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকট ও অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরাও রাস্তায় নেমে আসেন। এই আন্দোলন এখন কেবল স্কুলের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা নয়, বরং তরুণদের ভবিষ্যৎ ও রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার অসামঞ্জস্যতা নিয়ে এক বড় জাতীয় বিতর্কের রূপ নিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর দেশের ৩ হাজার ৭০০টি লিসের মধ্যে ৮৯১টি প্রতিষ্ঠানে ক্লাস হয় আংশিক অথবা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, রাজধানী প্যারিসের বাইরে বিভিন্ন শহরের বিক্ষোভে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ অংশ নেন। এছাড়া প্যারিসের কর্মসূচিতেও ২০ থেকে ৪০ হাজার মানুষের সমাগমের সম্ভাবনা ছিল। বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, সরকারি হিসাবে সারা দেশে মঙ্গলবারের এই বিক্ষোভে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো এখনও শিক্ষা, ভবিষ্যৎ ও সুযোগের সমতা ঘিরে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করছে, তাদের ভবিষ্যৎ ক্রমেই নম্বর ও প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভের মূলে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার দৈনন্দিন নানা সংকট। অনেক স্কুলে ভবন জরাজীর্ণ, নেই প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং তীব্র শিক্ষক সংকট বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে তার বিকল্প ব্যবস্থা থাকে না। শিক্ষার্থীরা জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, অতিরিক্ত গরম, অপরিচ্ছন্ন টয়লেট এমনকি ইঁদুরের উপদ্রবের মতো অভিযোগও তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ, দীর্ঘ যাতায়াত এবং পরীক্ষার ফল নিয়ে তৈরি হওয়া মানসিক উদ্বেগ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কেন্দ্রীয় পদ্ধতি ‘Parcoursup’ নিয়েও শিক্ষার্থীদের তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। তাদের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমেই অমানবিক নম্বরভিত্তিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোতে বৈষম্যের হার বেশি, যেখানে মৌলিক অবকাঠামোর অভাব স্পষ্ট। শিক্ষার্থীরা দাবি জানাচ্ছে, শিক্ষা খাতে অবিলম্বে বাড়তি অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করতে হবে। কোথাও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, আবার কোথাও মৌলিক অবকাঠামোও পর্যাপ্ত নয়।
আন্দোলনের বিস্তার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতা ও ধরপাকড়ের ঘটনাও বাড়ছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবমতে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ১ হাজার ৮০০ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু জানিয়েছেন, সংঘর্ষে অন্তত ২১৫ জন কিশোর এবং ৮৫ জন স্কুল কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হয়েছেন। এছাড়া ৭০০ জনের বেশি পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। উত্তরের লঁসে শহরে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর পুলিশের গ্রেনেড বিস্ফোরণে হাত ও বাহুর একাংশ হারানোয় বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু জায়গায় বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়েছে, তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছে। সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি ঘটে উত্তর ফ্রান্সের লঁসে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার এখন আলোচনার পথ বেছে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত প্রতিস্থাপন, স্কুল সময়সূচি পর্যালোচনা এবং জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের পরিকল্পনা তৈরি করতে। অক্টোবরের শেষ নাগাদ সরকার এ বিষয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তুলে ধরবে বলে জানানো হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শোনার জন্য একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মও চালু করেছে। শিক্ষা মন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে বিক্ষোভকারীদের একাংশ স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা কেবল আশ্বাস নয়, বরং দৃশ্যমান পরিবর্তন চায়। তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বলছে, শুধু তাদের কথা শোনা নয়, বাস্তব পরিবর্তনও দেখতে চায় তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়া, সরকারি ঋণের বোঝা এবং বাজেট সংকটের এই সময়ে শিক্ষা খাতে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সরকারের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই আন্দোলনকে সরকার পতনের আন্দোলন বলা না গেলেও, এটি স্পষ্ট যে তরুণদের নির্দিষ্ট দাবি যখন সামাজিক বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা দ্রুত জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশ, নেপাল কিংবা স্পেনের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের অভিজ্ঞতাও একই বার্তা দেয়—তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভকে দীর্ঘসময় উপেক্ষা করলে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব প্রাথমিক দাবির গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর যেতে পারে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন, নেপালে ২০২৫ সালের জেন-জি আন্দোলন কিংবা স্পেনে ২০২৬ সালের আবাসন সংকট ঘিরে বিক্ষোভের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, তরুণদের ক্ষোভকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা হলে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব প্রাথমিক দ।



