শান্তিতে নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাই: মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের অগ্রপথিক

, বিশ্ব

শান্তিতে নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাই: মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের অগ্রপথিক

আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার শিকার মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দীর্ঘ লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছরের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মী ও প্রবীণ আইনজীবী নাভি পিল্লাই (৮৫)। গত শুক্রবার নরওয়ের অসলোতে নোবেল কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় তাঁর সাহসী ভূমিকা এবং ব্যক্তিগত সততার প্রশংসা করেছে নোবেল কমিটি। নোবেল কমিটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পিল্লাইয়ের অগ্রণী ভূমিকার পাশাপাশি তাঁর বিচারিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিগত সততা ও সাহসকে গুরুত্ব দিয়েছে তারা।

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচারের পথ সুগম করতে পিল্লাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা যে চাপের মুখে রয়েছে, তা উল্লেখ করে ফ্রিডনেস বলেন, আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি বৈশ্বিক শ্রদ্ধা বর্তমানে ক্ষমতার রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবনের একটি বড় সময় কেটেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। তিনি রুয়ান্ডার গণহত্যার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচারক হিসেবে কর্মরত আছেন, যেখানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চলমান। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড তদন্তে জাতিসংঘের গঠিত কমিশনের প্রধান ছিলেন। সেই কমিশন গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনেছিল। তবে একজন আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে আমি বিষয়টি যাচাই করে নিতে চাই। পরে কৌতুক করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি আরেকটু বেশি তালি দেন, তবে আমি হয়তো এই পুরস্কার ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।’।

এই পুরস্কারের ঘোষণার পর নাভি পিল্লাই তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, এই সম্মান তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার ভুক্তভোগী এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে যাওয়া সবার উদ্দেশে উৎসর্গ করছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব এখন এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে যেখানে কার কষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, তা আইনের বদলে ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জার্মানিতে অবস্থানকালে পুরস্কারের খবর পাওয়ার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি একে ‘কৌতুক’ মনে করেছিলেন, তবে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আইন ও বিচার বিভাগের প্রতি নিজের অবিচল অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তাই তাৎক্ষণিকভাবে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানো সবাইকে তিনি বলছিলেন, ‘এটি নিশ্চয়ই একটি কৌতুক!…আপনাদের এই করতালি আমার কাছে অনেক মূল্যবান। তাঁর নোবেল পুরস্কারের জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী প্রতীকী বিষয়…আমি আর ভাবতেই পারছি না।

পিল্লাইয়ের এই নোবেল প্রাপ্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক। তিনি এটিকে মানবাধিকার আন্দোলনের জন্য একটি ‘সমষ্টিগত বিজয়’ বলে অভিহিত করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড নুরেমবার্গ আদালত থেকে এক ভিডিও বার্তায় পিল্লাইয়ের অর্জনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছে এবং একে ইসরায়েলবিরোধী বিদ্বেষকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। এর জবাবে নোবেল কমিটি স্পষ্ট করেছে, তারা পিল্লাইয়ের পেশাদারি ও সততার ওপর আস্থা রেখেছে এবং গাজা ইস্যুতে কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নিচ্ছে না। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্স পোস্টে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে।

নাভি পিল্লাইয়ের সংগ্রামী জীবনের শুরু ১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে। তামিল বংশোদ্ভূত এক বাসচালকের ঘরে জন্ম নেওয়া পিল্লাই বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ডারবানে নিজের আইন প্রতিষ্ঠান খোলেন, যা ছিল ওই এলাকায় কোনো অশ্বেতাঙ্গ নারীর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রথম আইনি প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৮ সালে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

পিল্লাই ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটিআর), আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার (ওএইচসিএইচআর) হিসেবে বিশ্বজুড়ে নারী ও শিশুদের অধিকারসহ মানবাধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদান রাখেন। বিশেষ করে রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি জানান, বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষা ও এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা অবিচল থেকেছেন।