সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় অন্তত ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৫০ জন। হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন কর্মকর্তা। এই হামলার ফলে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে তারা কাজ করছে। গতকাল শনিবারের এ হামলার বিষয়ে অবগত তিন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য জানিয়েছেন হামলার বিষয়ে অবগত দুজন পশ্চিমা ও একজন আরব কর্মকর্তা। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তাঁরা পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। এসব হামলায় শিশুসহ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। ইয়েমেনের এসব স্থাপনার ক্ষেত্রে যে নিয়ম প্রযোজ্য, বিশ্বের অন্য কোথাও একই ধরনের স্থাপনার ক্ষেত্রেও সেই নিয়ম প্রযোজ্য হতে হবে।’।
হুতি বিদ্রোহীদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি এই হামলার দায় স্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ইয়েমেনের বেসামরিক স্থাপনায় সৌদি আরবের চলমান বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই রিয়াদে এই পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে। আল-বুখাইতির মতে, ইয়েমেনের হাসপাতাল, বাজার, বিয়ের অনুষ্ঠান ও শোকসভার হলসহ যেসব স্থানে সৌদি বাহিনী হামলা চালাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বিশ্বকে সচেতন করতেই তারা এই পথ বেছে নিয়েছে। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। সীমান্তের ওপারে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বোমা হামলা চালাচ্ছে সৌদি যুদ্ধবিমান।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে রিয়াদ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আভার বিমানবন্দরেও হুতিরা হামলা চালিয়েছিল, যাতে বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটে। হামলার পর পুলিশ বিমানবন্দরের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয় এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা অন্তত ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সকে ঘটনাস্থলের দিকে যেতে দেখেছেন। রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস তাদের নাগরিকদের ওই এলাকা এড়িয়ে চলার পাশাপাশি যাতায়াত বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন হামলার বিষয়ে অবগত হয়েছে এবং এ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও পর্যটনের কেন্দ্রে পরিণত করার যে পরিকল্পনা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের রয়েছে, এই হামলার কারণে তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে রিয়াদে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া ‘ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কংগ্রেস’ এবং মাসের শেষদিকে অনুষ্ঠেয় বিনিয়োগ সম্মেলন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ উল্লেখযোগ্য। আয়োজকরা সূচি পরিবর্তনের কথা না বললেও ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন করতে দেখা গেছে। রিয়াদকে বৈশ্বিক ভ্রমণ ও ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত করতে চান তিনি।
এই সংঘাতের প্রেক্ষাপট দীর্ঘদিনের। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি জোট সামরিক অভিযান শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেয়। গত জুলাইয়ে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর গত সপ্তাহে পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ এবং সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার আঁচ এখন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হুতি বিদ্রোহীরা এখন আরও কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং দীর্ঘ এক দশকের যুদ্ধ তাদের সামরিক সক্ষমতাকে অটুট রেখেছে। ইয়েমেনের অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও হুতিদের কৌশলগত অবস্থান এবং লোহিত সাগরে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের গুরুত্ব অপরিসীম, যা এখন যুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর ইরানে হামলার পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এটি তার অন্যতম ভয়াবহ নজির। সৌদি যুবরাজকে এখন একদিকে হুতিদের ধারাবাহিক হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক লক্ষ্যপূরণে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এড়িয়ে চলার চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে।



