মাত্র ৫৭ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তনের জেরে টানা ২০ দিন ধরে অচল চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহাল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষকদের মধ্য থেকে নতুন উপাচার্য নিয়োগের দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধভাবে শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছেন। এই আন্দোলনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্যটিতে বদলি করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান সংকটের শুরু হয় ২৭ জুলাই, যখন যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূঁইয়াকে দায়িত্বের এক বছর নয় মাসের মাথায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। চলমান অস্থিরতার মধ্যে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরিফুল আলম দায়িত্ব নিলেও গত ১১ ও ১২ অক্টোবর যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আরাফাত রহমানকে রুটিন দায়িত্ব প্রদান করেন। তবে এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ শিবলী সাদিক ও সংশ্লিষ্ট একজন অতিরিক্ত সচিব। এ পরিস্থিতির সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের খবর নেই।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য পরিবর্তনের এই অস্থিরতা কেবল চুয়েটেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের ৬২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে সাধারণত চার বছরের জন্য উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও, সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাদের পরিবর্তন করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি বর্তমান সরকারের গত সাত মাসের শাসনামলে বেশ বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া অনেক উপাচার্যকে অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি নতুন সরকারের নিয়োগপ্রাপ্তদের নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। তবে নানা কারণে নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেই নির্ধারিত মেয়াদ পূরণের সুযোগ পাচ্ছেন না। ইচ্ছেমত যখন-তখন ভিসি পরিবর্তন করার ঘটনা ঘটছে। বর্তমান সরকারের গত সাত মাসে এ নিয়ে বিতর্ক আরো বেড়েছে। উপাচার্যের পাশাপাশি সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদেও পরিবর্তন এসেছে।
উপাচার্য নিয়োগে দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। সূত্রমতে, পতিত স্বৈরাচার সরকারের আমলে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে তুলনামূলক অযোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হতো, যা জুলাই বিপ্লবের পর ছাত্র-জনতার মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশার পরিপন্থী। সাবেক ইউজিসি চেয়ারম্যান ও ঢাবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ মনে করেন, বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। দলীয় কোন্দলে নিয়োগ বাণিজ্য ও ভিন্নমতের প্রতি বৈষম্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অসংগতিও প্রকট। গত ১৪ মে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. আনিসুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। একই দিনে নিয়োগ পাওয়া জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আমির হোসেন ভূঁইয়াকে ২৩ দিনের মাথায় সরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে সাত মাসের ব্যবধানে তিনবার উপাচার্য পরিবর্তন হয়েছে। এছাড়া গত ২৬ সেপ্টেম্বর বিএনপি ঘরানার হিসেবে পরিচিত জাবি উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসানকে দুই বছরের মাথায় অপসারণ করা হয়, যা ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করেছে।
বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নন এমন শিক্ষকদের উপাচার্য নিয়োগের প্রবণতা নিয়েও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাবির অধ্যাপক, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি বিভাগের অধ্যাপক ছবিরুল ইসলাম হাওলাদার এবং ডুয়েটে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবালকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, আইনে বাধা না থাকলেও বিশেষায়িত ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়াই কাম্য।
উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির কোনো ভূমিকা নেই বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির সচিব ড. ফখরুল ইসলাম। ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক বিলাল হোসাইন স্পষ্ট করেন যে, প্রশাসনিক দক্ষতা, একাডেমিক যোগ্যতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়োগের মাপকাঠি হওয়া উচিত, যা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনুপস্থিত। শুধু সরকারি উদ্যোগেই নয়, স্থানীয়ভাবে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের চাপে উপাচার্যদের পদত্যাগের ঘটনারও অভিযোগ রয়েছে, যার একটি উদাহরণ গত ৬ অক্টোবর রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে।
জুলাই বিপ্লবের অন্যতম লক্ষ্য ছিল কোটা ও বৈষম্য দূর করে মেধার মূল্যায়ন। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়া সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় ভুলে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি না করতে পারলে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির নির্দেশক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে।



