সৌদি আরবের রিয়াদে হুতি বিদ্রোহীদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দুই বাংলাদেশি নিহত এবং ২৪ জন আহত হওয়ার ঘটনায় প্রবাসীদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত ১০ই অক্টোবর রাত আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ লক্ষ্য করে এই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ভয়াবহ এই হামলায় মোট ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। নিহত দুই বাংলাদেশি হলেন বগুড়ার মো. শাহেদ আহম্মদ এবং কুমিল্লার মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরী। তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায়।
আহত বাংলাদেশিদের মধ্যে ১১ জন কর্মী এবং ১৩ জন ওমরাহ যাত্রী রয়েছেন। তাদের রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে কিং আব্দুল্লাহ হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন হাফেজ হাসান, কাজী নুরুল্লাহ ও মো. ওমর ফারুক। ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন সাফকাত রহমান ও মো. দাউদুল ইসলাম। রিয়াদ মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন মো. সাইমুল ইসলাম সৌরভ ও আবুল মনসুর মো. রিয়াজ উদ্দীন। এছাড়াও প্রিন্স সুলতান মিলিটারি হাসপাতালে মো. আব্দুল্লাহ, সুলাইমান আলহাবিব হাসপাতালের তাখাসসুসি শাখায় আরমান হোসেনসহ তিন জন, কিংডম হাসপাতালে মো. রফিক মিয়া এবং কিং খালেদ মেডিকেল সিটিতে ইসমাইল হোসাইন, মো. মিসবাহ উদ্দিন হীরক ও মো. রায়হানুল ইসলাম চিকিৎসাধীন। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ হাসপাতালে সালমা আক্তার, মো. শাহাদাত হোসেন, মোশাহিদ আহমেদ সৈকত, জাহিদ আহমেদ ও সোহবে সাদেক মো. শাহজাহান সরকার ভর্তি রয়েছেন। এছাড়া এজতাহ সনদ হাসপাতালে মো. আসাদুল ইসলাম ও মো. জামাল, সুলাইমান ফকিহ হাসপাতালে নাজমা আক্তার এবং সুলাইমান আলহাবিবের আলসাহাফা শাখায় উমায়ের ও আব্দুল্লাহ কামিল চিকিৎসাধীন আছেন। আহতদের মধ্যে তিনজন কিং আব্দুল্লাহ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।
রিয়াদে কর্মরত নাজমুল ইসলাম জানান, প্রতিনিয়ত মিসাইল আতঙ্কে থাকতে হয়। তিনি বলেন, আমরা যখন মিসাইল আতঙ্কে থাকি, তখন দেশে থাকা আমাদের পরিবারের সদস্যরা আমাদের মৃত্যুর আশঙ্কায় প্রহর গুনেন। দিনের মধ্যে বারবার সতর্কবার্তা আসায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজের জন্য বের হতে হয়। সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নোয়াখালীর অনেক প্রবাসী একই কারখানায় কাজ করলেও হামলার আগে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায় না। শুধু সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো মোবাইল নোটিফিকেশনই তাদের একমাত্র ভরসা। কিছুক্ষণ পরপরই মোবাইলে ভেসে আসছে হুতিদের মিসাইল হামলার সতর্কবার্তা। কখন মিসাইল এসে পড়ে- এই আতঙ্ক নিয়ে যাচ্ছেন কর্মক্ষেত্রে। ভীতিকর এমন পরিস্থিতির মধ্যেই থাকতে হচ্ছে তাদের। উদ্বিগ্ন দেশে থাকা এসব প্রবাসীর স্বজনরাও।
আরেক প্রবাসী আরিফুল ইসলামের ভাষ্যমতে, আতঙ্ক সঙ্গী করেই কাজের জায়গায় যেতে হচ্ছে, কারণ জীবিকার তাগিদে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। রিয়াদের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জানান, ক্রমবর্ধমান এই অস্থিরতার মাঝে থাকাটা দুঃসহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইকামার বিপুল খরচ মেটানোর পর এই নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। রিয়াদ বিমানবন্দরের নিকটবর্তী এলাকা থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নোয়াখালীর আরেক প্রবাসী জানান, যারা ভুক্তভোগী নয়, তাদের কাছে এই আতঙ্কের ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
এদিকে হামলার কারণে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় দেশে ছুটিতে থাকা প্রবাসীরা সৌদি আরবে ফিরতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ঢাকা থেকে সৌদিগামী অনেক ফ্লাইট স্থগিত বা বাতিল হওয়ার কারণে অনেকে বিকল্প উপায়ে ফেরার চেষ্টা করছেন। হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্রের এই আতঙ্ক কেবল রিয়াদের প্রবাসীদেরই নয়, বরং দেশে থাকা তাদের স্বজনদের মনেও গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। অনাগত দিনগুলো কীভাবে কাটবে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন রিয়াদপ্রবাসী বাংলাদেশিরা।



