রুশ জ্বালানি ও ভারতের নির্ভরতা নিয়ে মার্কিন অবস্থান

, বিশ্ব

রুশ জ্বালানি ও ভারতের নির্ভরতা নিয়ে মার্কিন অবস্থান

রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা বা বিকল্প উৎসে সরে আসা ভারতের জন্য কতটা কঠিন, তা স্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, ভারত স্বেচ্ছায় জ্বালানি আমদানির বৈচিত্র্য বাড়ালেও তাদের চাহিদার একটি বিশাল অংশ এখনো রাশিয়ার ওপর টিকে আছে। এই নির্ভরতা রাতারাতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় বলেই মনে করছে ওয়াশিংটন। তবে দেশটি এখনও রাশিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি কিনছে। এক দিন থেকে আরেক দিনে সরবরাহের উৎস পরিবর্তন করা কঠিন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং রুশ জ্বালানি ক্রয়কারী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের প্রভাব বিশ্লেষণের জন্য ৬০ দিনের সময় চেয়েছেন। শনিবার ভারত ও উজবেকিস্তান সফরের প্রাক্কালে সংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও জানান, প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের বিষয়টি শুধু রাশিয়ার ওপর সীমাবদ্ধ নয়। ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্ব অর্থনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর এর প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চায়।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের প্রভাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির জটিলতা বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান অস্থিরতা, সৌদি আরবে হুথিদের হামলা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তাই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আগে ওয়াশিংটন সব দিক সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করছে।

গত শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়া ও ইরান সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আইনের আওতায় কিছু বিষয়ে সাময়িক ছাড় দিয়েছে। জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে আপাতত দেশগুলোর ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা দেশের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা রাখা হয়েছে। ভারত ও চীন এই তালিকার সম্ভাব্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। তাই নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক কার্যকরের সম্ভাব্য ফলাফল পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

রুবিও উল্লেখ করেন, আইনটি প্রণয়নের সময় থেকেই পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা যেন বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এর কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যহ্রাস করার লক্ষ্যে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার অবদান ছিল মাত্র ২ শতাংশ বা তারও কম।

যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া এশিয়ার বাজারে ছাড় মূল্যে তেল বিক্রি শুরু করলে ভারতের শোধনাগারগুলোর কাছে তা সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে। এর ফলে রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো সময় ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই এসেছে রাশিয়া থেকে। গত সেপ্টেম্বরেও দেশটি দৈনিক প্রায় ১৯ লাখ ব্যারেল রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যা ওই সময়ের মোট আমদানির প্রায় ৩৫ শতাংশ।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, তারা বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব সম্পর্কে ভারতকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে নয়াদিল্লি।