কাতারের সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা তাদের সাংবাদিকদের ডিভাইসে ইসরাইলি সাইবার প্রযুক্তি কোম্পানি ক্যান্ডিরু ও ডিসকভার-টেকের তৈরি ক্ষতিকারক স্পাইওয়্যার ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
কানাডাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিটিজেন ল্যাবের অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর সাইবার হামলার প্রমাণ মিলেছে।
এই ঘটনাকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি ও নজিরবিহীন আঘাত হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আল-জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক। একই সঙ্গে তারা জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে। আল-জাজিরা জানিয়েছে, এই সহযোগিতা হামলাগুলোর সত্যতা যাচাই ও নথিভুক্ত করতে সহায়তা করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালে, যখন আল-জাজিরার নিজস্ব প্রযুক্তি দল কর্মীদের ব্যবহৃত ডিভাইসে অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত চলা এই সন্দেহজনক নজরদারি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি গবেষণা ইউনিট সিটিজেন ল্যাবের সহযোগিতা নেওয়া হয়। তাদের বিশদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, হ্যাকাররা অত্যন্ত জটিল ‘জিরো-ক্লিক’ কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল, যার মাধ্যমে কোনো ব্যবহারকারীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব।
গবেষণা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর্তৃক কালো তালিকাভুক্ত ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান ক্যান্ডিরুর তৈরি স্পাইওয়্যার ব্যবহার করেই এসব ফোনে আড়িপাতা হয়। অত্যন্ত উন্নতমানের এই সাইবার অস্ত্র তৈরিতে কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এটি মূলত এনক্রিপ্ট করা চ্যানেলের মাধ্যমে চুরি করা তথ্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর হ্যাকারদের সার্ভারে পাঠিয়ে দিত, যাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার নজর এড়িয়ে থাকা সহজ হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থার নজর এড়াতে স্পাইওয়্যারটি চুরি করা তথ্য এনক্রিপ্ট করা চ্যানেলে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নির্দিষ্ট সময় পরপর হ্যাকারদের কাছে পাঠাত। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে টরন্টোভিত্তিক দলটি জানায়, ‘হামলার সময় সংগৃহীত নেটওয়ার্ক লগের বিশদ বিশ্লেষণ এটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল তার স্পষ্ট সময়রেখা প্রদান করে।
ক্ষতিকারক এই স্পাইওয়্যারটি ডিভাইসে থাকা সব ধরণের স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা রাখে। এতে নথিপত্র, ব্রাউজারের কুকিজ, সংরক্ষিত পাসওয়ার্ড, বুকমার্কসহ বিভিন্ন ইমেইল ও ব্যক্তিগত বার্তা চুরি করা সম্ভব। এছাড়াও হ্যাকাররা কি-বোর্ডের টাইপিং, স্ক্রিনশট নেওয়া এবং মাইক্রোফোন ও ওয়েবক্যামের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যবহারকারীর গোপন আলাপ রেকর্ড করতে পারে। আল-জাজিরার যে কয়েকজন সাংবাদিক এই হামলার শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আক্রান্ত হওয়া লাখ লাখ ডিভাইসের মধ্যে আল-জাজিরার কয়েকজন সাংবাদিকের ফোনও ছিল, যাদের অনেকে স্পর্শকাতর বিষয়ে সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন।
এর আগেও ক্যান্ডিরুর তৈরি স্পাইওয়্যারের বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নজরদারির অভিযোগ উঠেছে। এর আগে অন্তত ১০০ জন সাংবাদিক, ভিন্নমতাবলম্বী ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ফোনে এই স্পাইওয়্যারের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। সিটিজেন ল্যাবের বিশ্লেষণে এই সাইবার হামলার নিখুঁত সময়রেখা উঠে আসায় আল-জাজিরা তাদের ডিভাইসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন শুরু করেছে।
সংবাদমাধ্যমটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কেবল নিন্দা জানিয়েই ক্ষান্ত হবে না তারা, বরং নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবস্থা সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবে। ক্যান্ডিরুর মতো সাইবার প্রতিষ্ঠানগুলোর অত্যাধুনিক নিরাপত্তা প্রতিরক্ষাকে ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের জন্য এক বড় ধরনের ঝুঁকির বার্তা নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক চাপে এই ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না।



