ইলন মাস্কের উড়ন্ত টেসলা রোডস্টার: প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

, তথ্য-প্রযুক্তি

ইলন মাস্কের উড়ন্ত টেসলা রোডস্টার: প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

টেসলার নতুন প্রজন্মের ‘রোডস্টার’ মডেলের গাড়িটি কেবল গতিতেই নয়, বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে বাতাসে ভেসে থাকার সক্ষমতা দেখিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ সাকশন প্রযুক্তির সাহায্যে গাড়িটি উল্টো হয়েও চলতে পারবে। আর তাই সম্প্রতি টেসলা রোডস্টার গাড়ির উড্ডয়নক্ষমতা প্রদর্শনের পর থেকেই বাংলাদেশসহ প্রযুক্তি বিশ্বে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। পরে গাড়িটি সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা কয়েকটি গাড়ির ওপর দিয়ে লাফিয়ে যায়। এই বলের প্রভাবে গাড়ি বিপরীত দিকে এগিয়ে যায়।

গাড়িটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৩০ মাইলের বেশি। এর বিশেষ ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষমতার কারণে মাত্র এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে এটি শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৬০ মাইল বা প্রায় ৯৭ কিলোমিটার গতি অর্জন করতে পারে। গাড়িটির সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো এতে যুক্ত থাকা রকেট থ্রাস্টার, যা একে মাটি থেকে ওপরে ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে। টেক রাডারের তথ্য অনুযায়ী, প্রদর্শনীতে গাড়িটিকে আকাশে লাফ দিতে এবং ভারসাম্য রক্ষা করে অবতরণ করতে দেখা গেছে, যা দর্শকদের বিস্মিত করলেও এর নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রদর্শনীতে গাড়িটির থ্রাস্টারগুলোর কার্যকারিতা দেখাতে রোডস্টারকে প্রথমে উল্টো করে আবার সোজা করা হয়। এমন প্রদর্শনী দর্শকদের মুগ্ধ করলেও প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গাড়িটির ‘রকেট’ সংস্করণে সর্বোচ্চ ১০টি থ্রাস্টার ব্যবহার করা হবে, যা স্পেসএক্সের রকেট প্রযুক্তির আদলে তৈরি। বিশেষ করে ফ্যালকন ৯ রকেটের বুস্টার নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যে প্রযুক্তি কাজ করে, তার অনুকরণেই রোডস্টারের এই কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টারগুলো ডিজাইন করা হয়েছে। এই থ্রাস্টারগুলো কার্বন ফাইবার ওভারর‍্যাপড প্রেসার ভেসেল (সিওপিভি) নামক ট্যাংকের মাধ্যমে কাজ করে। ট্যাংকের ভেতরে থাকা উচ্চচাপের বাতাস দ্রুত বের করে দিয়ে বিপরীতমুখী বল তৈরির মাধ্যমে গাড়িটি মাটি থেকে ওপরে ওঠে। যদিও এটি জ্বালানি পোড়ায় না, তবুও এর প্রবল শক্তি সাধারণ রাস্তায় চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব ট্যাংকে অত্যন্ত উচ্চচাপে বাতাস জমা রাখা হয়। নামের মধ্যে ‘কোল্ড’ বা ঠান্ডা শব্দটি থাকলেও এখানে বাতাসকে শীতল করার বিষয়টি বোঝানো হয়নি। ফলে শহরের যানজটের ওপর দিয়ে উড়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর ধারণাটি আপাতত বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে না। অন্যদিকে, দুই আসনবিশিষ্ট ‘থ্রাস্ট’ সংস্করণে থাকবে তুলনামূলক কমসংখ্যক থ্রাস্টার।

নিরাপত্তার বিষয়ে টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক জানিয়েছেন, আপাতত গাড়িটির নকশায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। তিনি আরও জানান, গাড়িটি সড়কে চলার উপযোগী কি না তা নির্ভর করছে রাস্তাটির ধরনের ওপর। ২০২৮ সালে উৎপাদন শুরুর পর গাড়িটি কেবল নির্বাচিত গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করা হবে। টেসলার ওয়েবসাইটে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, রকেট থ্রাস্টারযুক্ত সংস্করণটি সাধারণ রাস্তায় চলাচলের জন্য অনুমোদিত নয়। এর বিপরীতে, ‘পারফরম্যান্স’ সংস্করণটি সাধারণ সড়কের জন্য উপযোগী করা হবে, যেখানে কোনো রকেট থ্রাস্টার থাকবে না। তবে এসব কসরতের বাইরে দীর্ঘ সময় উড়তে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

গাড়িটির রকেট থ্রাস্টারের শক্তি এতটাই বেশি যে এটি প্রায় ৯ টন ওজনের কোনো বস্তুর আঘাতের সমতুল্য। রকেট সংস্করণের পেছনে চারটি থ্রাস্টার একসঙ্গে ৮০ কিলো নিউটনের বেশি বল তৈরি করতে পারে। এ ধরনের শক্তিশালী বাতাসের ধাক্কায় আশপাশে থাকা মানুষের হাড় ভেঙে যাওয়া বা অভ্যন্তরীণ অঙ্গহানির গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া থ্রাস্টার থেকে নির্গত গ্যাসের তীব্র গতির কারণে রাস্তা থেকে পাথর বা ছোট টুকরাগুলো বুলেটের মতো ছিটকে মানুষের বা অন্য গাড়ির ক্ষতি করতে পারে। ট্রাফিক জ্যাম বা সিগন্যালে থাকা অবস্থায় এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলাফল হতে পারে মারাত্মক। উড়ন্ত গাড়িটি আশপাশে চলাচল করা গাড়ি বা মানুষের বিপদের কারণ হবে বলেও সমালোচনা করছেন অনেকে। এই সংস্করণ সীমিত পরিসরে বাজারজাত করা হবে। এমনকি শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ট্রাফিক সিগন্যাল সবুজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চালক থ্রাস্টার চালু করলে পেছনে থাকা গাড়িও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

চালকের সুরক্ষার বিষয়টিও পুরোপুরি অনিশ্চিত। মাঝ-আকাশে গাড়িটি উল্টে যাওয়া বা ভারসাম্যহীন হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে সাধারণ গাড়ির সিটবেল্ট বা এয়ারব্যাগ কার্যকর নাও হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রোলার কোস্টারের মতো বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া গাড়িটি কতক্ষণ আকাশে ভেসে থাকতে পারবে, সে বিষয়ে টেসলা এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি। সব মিলিয়ে, উড্ডয়ন প্রযুক্তি চমকপ্রদ মনে হলেও সাধারণ রাস্তায় এর ব্যবহার মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।