দেশের স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি জানিয়েছেন, আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হবে। এই অর্থের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং চিকিৎসকসহ জনবল সংকট দূর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সব কমিউনিটি ক্লিনিকের নাম পরিবর্তন করে ‘ফ্যামিলি ওয়েলবিয়িং সেন্টার’ করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। ময়মনসিংহ ছাড়াও আশপাশের আট থেকে দশটি জেলার মানুষ এ হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল।
শনিবার ময়মনসিংহের ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। পরিদর্শনকালে হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ড, লেবার ওয়ার্ড, হাম আইসোলেশন ও ডেঙ্গু ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন মন্ত্রী। এ সময় তিনি হাসপাতালের সেবার মান, পরিচ্ছন্নতা এবং শৌচাগারের বেহাল দশা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে নতুন ভবনের নিচতলায় ময়লা-আবর্জনা দেখে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত পরিষ্কার ও সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, হাসপাতালের চিকিৎসকদের উপস্থিতির রোস্টার সংগ্রহ করা হয়েছে। সকাল ১০টা বা পৌনে ১১টায় কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়ার মতো গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ময়মনসিংহে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনবল সংকট থাকলেও চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা সহ্য করা হবে না। এছাড়া গাইনি ওয়ার্ডে এক রোগীকে বাইরে থেকে স্যালাইন কিনতে বাধ্য হওয়ার বিষয়টি নজরে এলে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং ওই রোগীকে নিজ হাতে এক হাজার টাকা সহায়তা দেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কয়েকজন চিকিৎসককে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের রোস্টার সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কতজন চিকিৎসক অনুপস্থিত ছিলেন, তা যাচাই করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দায়িত্বে অবহেলা বা চিকিৎসায় গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান মন্ত্রী। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে মশারির ব্যবস্থায় মোটামুটি সন্তোষ প্রকাশ করলেও রোগীদের চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে যথাযথ তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। গত ১৭ বছরে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এসব সমস্যা একদিনে কিংবা এক মাসে দূর করা সম্ভব নয়। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কম থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যেতে দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার নামে অনিয়মের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
হাসপাতালের ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত রোগীর চাপের বিষয়টি স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, এক হাজার শয্যার বিপরীতে এখানে প্রতিদিন প্রায় তিন থেকে চার হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। এতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা উপকরণের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। বিদ্যমান জনবল সংকট মোকাবিলায় সরকার পাঁচ হাজার নার্স এবং স্বাভাবিক প্রসবের হার বৃদ্ধিতে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। এছাড়া ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপনসহ দেশে পাঁচটি রোবোটিক সার্জারি ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পরিদর্শনকালে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত রোগীর চাপ, অপরিচ্ছন্নতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও সেবাব্যবস্থার নানা দুর্বলতা উঠে আসে। তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক যেখানে ৫০ জন রোগী দেখার সক্ষমতা রাখেন, সেখানে তাঁকে ২৫০ থেকে ৩০০ জন রোগী দেখতে হলে স্বাভাবিকভাবেই সেবার ওপর চাপ পড়ে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর উন্নয়নেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জানান, ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ১৫০-এ উন্নীত করা হবে। এছাড়া ডায়ালাইসিস, ফিজিওথেরাপি এবং শিশুদের জন্য পৃথক শয্যার ব্যবস্থা করা হবে। তারাকান্দা হাসপাতালে দ্রুত ইনডোর সেবা চালুর নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই চিকিৎসক নিয়োগের মাধ্যমে এই সেবা নিশ্চিত করা হবে। লোকবল সংকটের কারণে বন্ধ থাকা শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সেবা এক সপ্তাহের মধ্যে চালু করার কথাও জানান তিনি। ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০-এ উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা বেসরকারি ক্লিনিক ও দালাল চক্রের বিষয়েও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে ক্লিনিক স্থাপনের সরকারি নিয়ম কঠোরভাবে পালন করতে হবে। বিদ্যমান ক্লিনিকগুলোর নিয়মিত তদারকি করা হবে এবং অনিয়ম বা সেবায় ত্রুটি পাওয়া গেলে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে।
গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, সংবাদের মাধ্যমে হাসপাতালের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো বেরিয়ে আসায় সরকারের সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়। ভালো কাজের প্রশংসার পাশাপাশি ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে উন্নয়নমূলক কাজে সাংবাদিকদের সহায়তা কামনা করেন তিনি। রোগীদের চিকিৎসাসেবা, ওয়ার্ডের পরিবেশ, শৌচাগার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পর্যবেক্ষণ করেন।
পরিদর্শনকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হোসেন, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা, জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান এবং জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



