একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব।
কিন্তু রাষ্ট্রের এই বাহিনীটির প্রধান যখন জনসম্মুখে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ার নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেন, তখন তা পুরো সমাজকেই ভীত করে তোলে।
সোমবার রাজধানীর চকবাজারে ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের মন্তব্য সেই আশঙ্কার জায়গাটি স্পষ্ট করেছে। তিনি বলেন, ‘ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অনুমতি দেয়, আমরা তা করব। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন—এটি স্বীকার করে নিয়ে আমাকে সংবিধান ও আইন মেনে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিন।’ আমাদের সরকার, রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠানগুলো যে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে কিছুই শিখতে চায় না এবং অতীত ভুলের পুনরাবৃত্তি করার বাসনা যে ত্যাগ করতে পারে না, তা দুই দিন পরপর আমরা বুঝতে পারি। পুলিশের আইজি বলেন, সরকার অনুমতি দিলে তাঁরা ক্রসফায়ার করতে পারবেন—প্রথমত, এই উক্তিই দেশের নাগরিকদের জন্য অপমানজনক।
পুলিশপ্রধানের এই বক্তব্যের পর জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরিবর্তে বাহিনীটি কি নাগরিকের জীবন হরণের দিকে ঝুঁকছে? অথচ সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে যে, আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যখন আইন ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে প্রাণনাশের ইঙ্গিত দেন, তখন তা সাধারণ মানুষের জন্য চরম অপমানজনক ও শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর যে প্রশ্নটি উঠছে তা হচ্ছে, তারা কি নাগরিকের জন্য সুরক্ষা বলয় তৈরি করবে, নাকি নাগরিকের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। জনগণের করের টাকায় বেতনভুক্ত এবং জনগণের সেবা দেওয়ার ওয়াদা নিয়ে দায়িত্বরত একজন কর্মকর্তা যখন বিচারবহির্ভূতভাবে নাগরিককে মেরে ফেলার বাসনা প্রকাশ করেন, তা কতটা ‘অসাংবিধানিক’, অপমানজনক ও ভীতিকর, তা পাঠক সহজেই অনুমান করতে পারছেন।
পুলিশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই, কিন্তু এই প্রয়োজনীয়তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে নাগরিক সমাজের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। জুলাই অভ্যুত্থানের মূল দাবিগুলোর একটি ছিল প্রাণের নিরাপত্তা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান। সেখানে পুলিশ বাহিনীর প্রধানের কাছ থেকে এই ধরনের বক্তব্য আসা যেন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেয়। সরকার অনুমতি দিলেই প্রাণহানি বৈধ হয়ে যায়—এই যুক্তি কোনোভাবেই একটি আধুনিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ, আমরা যখন আলোচনা করি—পুলিশ মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারবে না, তখন সেই আলাপকে সমাজ ও রাষ্ট্রে পুলিশের ‘প্রয়োজনীয়তা’র স্তরে নিয়ে আসার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে আমাদের মূল উদ্বেগকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া। শুরু থেকেই দুনিয়ার প্রায় সব মানবাধিকার সংগঠন এগুলোর বিরোধিতা করে অজস্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছে। পাশাপাশি গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে এ ধরনের ঘটনার যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হয়েছে, তাতে রাষ্ট্র বিনা বিচারে কাউকে প্রাণে মেরে ফেলতে পারে না, সে বিষয়ে ঐকমত্যই ছিল মূল সুর। এই যদি হয় কোনো বাহিনীপ্রধানের অবস্থান, তাহলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে তদন্ত কে করবে—এই প্রশ্নের গুরুত্ব আবার সামনে চলে আসে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি পদ্ধতিগত সমস্যা, তার প্রমাণ পাওয়া যায় অতীতের বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণে। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র্যাবের চেয়ে পুলিশের (ডিবিসহ) সম্পৃক্ততা ছিল বেশি (৪৮.০৫ শতাংশ)। এমনকি টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের মতো কর্মকর্তারা বন্দুকযুদ্ধের অজুহাতে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদক বিপিএম-ও পেয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, বাহিনীগুলো এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে দেখেই না, বরং একে কর্মদক্ষতা হিসেবে গণ্য করে থাকে। ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কতটা আইনি, কতটা বেআইনি কিংবা কতটা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, তা ২০০৪ সালের পর থেকে কখনোই তর্কের বিষয়ই ছিল না। এমনকি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র্যাবের (বর্তমানে র্যাব বিলুপ্ত হয়ে এসআরবি হয়েছে) সম্পৃক্ততার জন্য আন্তর্জাতিক মহল থেকে অনেকবারই র্যাব নিষিদ্ধের সুপারিশও এসেছে। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ডিবিসহ পুলিশ বাহিনীর (৪৮.০৫ শতাংশ) সম্পৃক্ততা র্যাব বাহিনীর (৩১.৯ শতাংশ) চেয়ে বেশি ছিল। এ কারণেই সব আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সরকারি প্রেসনোটের ভাষা ও যুক্তিকাঠামো সর্বদা সমান থাকে। যেমন টেকনাফ থানার বহুল আলোচিত সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বন্দুকযুদ্ধের জন্য ২০১৯ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ বা বিপিএম পেয়েছিলেন।
আইজিপি দাবি করেছেন যে, পুলিশের সদস্যদের অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ বা অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু যখন বাহিনী প্রধান নিজেই প্রকাশ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন, তখন সেই তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এমন মানসিকতা প্রমাণ করে যে, পুলিশ বাহিনীর প্রশাসনিক কাঠামোতে এখনো ঔপনিবেশিক প্রভাব বিদ্যমান। নাগরিকবান্ধব ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের যে সুবর্ণ সুযোগ গণ-অভ্যুত্থানের পর এসেছিল, পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এমন মন্তব্যে তা আবারও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবু সংবিধান ও দণ্ডবিধির ভাষায় এমন কিছু ফাঁকফোকর আছে, যা দিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী চাইলেই যেকোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ‘বৈধ’ করে ফেলতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের সদস্যরা কেউ অপরাধ করলে আমরা যদি ব্যবস্থা না নিই, তখন আপনি বলতে পারেন যে আপনারা তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি।’।
ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। সেখানে আত্মরক্ষার আইনি অধিকারের কথা উল্লেখ করা হলেও সাধারণ মানুষ এটিকে প্রচ্ছন্ন হুমকি হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে টিআইবিসহ বিভিন্ন সংস্থা এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং অবিলম্বে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে অনেক দেশে আন্দোলন বা অস্থিরতা থাকলেও পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির নজির খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে পুলিশপ্রধানের মুখ থেকে এমন মন্তব্য আসা নাগরিক জীবনের সুরক্ষার পথকে আরও সংকুচিত করে দিচ্ছে। ক্রসফায়ারের সঙ্গে র্যাবের নাম সব সময় উচ্চারিত হলেও পুলিশ বাহিনীও এতে জড়িত। পদক পাওয়ার জন্য তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে যে ছয়টি কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন, তার সব কটি ঘটনাতেই আসামি নিহত হয়েছিলেন (, ৬ আগস্ট ২০২০)। এ কথাটি অন্তত ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই বলা যায় না। বর্তমান বিশ্বের বহু দেশে আন্দোলন সহিংস রূপ নিলেও কোথাও পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির নজির সচরাচর মেলে না।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যেখানে নাগরিকের জীবনের সুরক্ষা ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা হওয়ার কথা ছিল অগ্রাধিকার, সেখানে একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রধানের কাছ থেকে এ ধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকি জনমনে গভীর বিষাদ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে নাগরিকমুখী করা হয়নি এবং অতীতের ভুল সংশোধনের ইচ্ছা যে নেই, আইজিপির এই বক্তব্য তারই এক তিক্ত উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।



