ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলে আরব দলগুলোর অভাবনীয় সাফল্যের পর প্রধানমন্ত্রী ও লিকুদ পার্টির নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভোট জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, এই সাফল্যের পেছনে কারচুপি রয়েছে, যদিও তিনি এখন পর্যন্ত নিজের দাবির স্বপক্ষে কোনো ठोस প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। উল্টোদিকে, আরব নেতারা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক উসকানি দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে, ভোটগ্রহণের সময়—এমনকি তার পরও নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা আরব ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ার বিষয়ে বারবার সতর্ক করেছেন। আরব শহরগুলোয় ভোট কেনাবেচা ও ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তদন্তের আহ্বানও জানিয়েছে লিকুদ। তবে এখন পর্যন্ত সেসব প্রমাণ প্রকাশ করেনি তারা। নেতানিয়াহুকে হটাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটের আহ্বান মার্কিন ইহুদিদের। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট কি সত্যিই আরব দলগুলোর পাশে দাঁড়ালেন।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেন। এর ফলে নেতানিয়াহু কিংবা তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট—কারোরই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সহজ পথ খোলা নেই। এই জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু এবং তাঁর কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের পক্ষ থেকে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
নির্বাচনে ৯৯ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী-ধর্মীয় জোট আসনসংখ্যায় সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছে। নেতানিয়াহুর জোট ছেড়ে বিরোধী জোটে যেতে আগ্রহী ইউটিজে।
তাদের দখলে রয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে, গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও মধ্য-বামপন্থী জোটের ঝুলিতে রয়েছে ৪৮টি আসন। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন, যা কোনো পক্ষই অর্জন করতে পারেনি। ধারণা করা হচ্ছে, ২১ শতাংশ আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দলগুলো রেকর্ড ১৯টি আসনে জয়ী হতে চলেছে, যা আইজেনকটের জোটের জন্য সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে দুই নেতার কোনো জোটই ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পায়নি। ওই অঞ্চলে আরব জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ জোরদার করার পেছনে নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য হলো আইজেনকটকে এমন কোণঠাসা অবস্থায় ফেলা, যাতে তিনি কোনোভাবেই আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের কথা চিন্তা করতে না পারেন। রাইখম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আইতান গিলবোয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, নেতানিয়াহুর মূল উদ্দেশ্য হলো ইসরায়েলের আরব ও ইহুদি নাগরিকদের মধ্যে রাজনৈতিক সহযোগিতা গড়ে ওঠাকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলা।
এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে ভোট জালিয়াতির অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ নির্বাচনে অজ্ঞাত বিদেশিদের হস্তক্ষেপের চেষ্টার যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতকে দায়িত্ব দিয়েছেন। সোলবার্গের এই পদক্ষেপকে পুঁজি করে লিকুদ পার্টি দাবি করছে, এটি ইসরায়েলের গণতন্ত্রের ওপর হামলা।
আরব দল জয়েন্ট লিস্টের নেতা আহমাদ তিবি জানিয়েছেন, ভোটের ফলাফলকে বিতর্কিত করতে নেতানিয়াহু বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা চালাচ্ছেন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, এই প্রচারণার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আইজেনকটকে ভয় দেখানো। এদিকে রাআম পার্টির প্রধান মনসুর আব্বাস জালিয়াতির অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, আরব নাগরিকদের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর উসকানি ভিত্তিহীন এবং এতে কোনো কাজ হবে না।
নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি পুলিশ দক্ষিণাঞ্চলের আরব অধ্যুষিত এলাকায় অন্তত সাতজনকে ভোট জালিয়াতির সন্দেহে গ্রেপ্তার করেছে। যদিও লিকুদ পার্টি দাবি করছে তাদের কাছে জালিয়াতির প্রমাণ রয়েছে, কিন্তু তা এখনো জনসমক্ষে আনা হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হলে নেতানিয়াহু কি আইসিসির পরোয়ানাসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতার মুখে পড়বেন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা চলছে।



