ফ্রান্সে ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ৫৬৫

, বিশ্ব

ফ্রান্সে ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ৫৬৫

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, তীব্র আয়বৈষম্য এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করুণ অবস্থার প্রতিবাদে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো রাজপথে নেমে এসেছেন লাখো সাধারণ মানুষ। শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস এবং জলকামান ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। দিনভর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জেরে সারা দেশে মোট ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, স্টান গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ করে।

বিক্ষোভের বড় একটি অংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে মিছিলের শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটে। হ্যালোইন উৎসবের দিন হওয়ায় মিছিলে অংশ নেওয়া অনেকের পোশাকে ছিল বিচিত্র ভুতুড়ে রূপ। কেউ স্পাইডারম্যান আবার কেউ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বা ডাইনির সাজে মিছিলে থাকলেও, তাদের মূল দাবি ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সামাজিক বৈষম্য দূর করা। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে আশপাশে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। বোর্দো ও মার্সেইসহ কয়েকটি শহরে উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের শহরের কেন্দ্রস্থলে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাটের চেষ্টা ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী তৎপর ছিল। এক প্রবীণ নারী হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে অংশ নেন, যাতে লেখা ছিল—‘বয়স্করাও অতিষ্ঠ’।

বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি তথ্য ও আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন, যার মধ্যে প্যারিসের সংখ্যা ৭০ হাজার। তবে যুব সংগঠন ও বিভিন্ন শিক্ষার্থী ইউনিয়নের দাবি, দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ আন্দোলনে নেমেছিলেন এবং শুধু প্যারিসেই উপস্থিত ছিলেন প্রায় দুই লাখ বিক্ষোভকারী। এর আগের দুই সপ্তাহেও বড় বিক্ষোভ হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৪২২ এবং পরে ৫১১ জন বলে জানানো হয়েছিল। বিক্ষোভ ঘিরে আগেই নিরাপত্তা জোরদার করেছিল সরকার। আন্দোলনে শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষও অংশ নিচ্ছেন। তাদের ধারণা, সরকার তাঁদের দাবি যথাযথভাবে শুনছে না।

এর আগে ১৭ অক্টোবর ৫ লাখ ৫০ হাজার এবং ২৪ অক্টোবর ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। যদিও তৃতীয় সপ্তাহে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবুও আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন। প্যারিসের পূর্বাঞ্চলে আয়োজিত মিছিলটি কয়েক ঘণ্টা শান্তিপূর্ণভাবে চলার পর পোর্ত দ্য শারঁতনে পৌঁছালে সহিংস রূপ নেয়। এ সময় কালো পোশাক ও মুখোশধারী ব্যক্তিরা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল, কাচের বোতল ও আতশবাজি ছোড়েন এবং আবর্জনার স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেন। ওই দিনের আন্দোলন একপর্যায়ে ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নেয়। কালো পোশাক ও মুখোশ পরা কয়েক ডজন ব্যক্তি হাতুড়ি দিয়ে রাস্তার পাথর তুলে পুলিশের দিকে ছুড়তে থাকেন। তাদের মধ্যে তিনজন পেট্রলবোমার আগুনে দগ্ধ হন।

প্যারিসের নিরাপত্তা ব্যারিকেড লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ছোড়ার ঘটনায় এক পুলিশ সদস্যের শরীরে আগুন ধরে যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, ওই সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন এবং ঘটনাটিকে তিনি ‘হত্যাচেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সব মিলিয়ে প্যারিসে চার পুলিশ ও একজন জেন্ডারম সদস্য আহত হয়েছেন। বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারম বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। এ ঘটনাকে তিনি ‘হত্যাচেষ্টার’ সঙ্গে তুলনা করেন। সড়ক, রেলস্টেশন ও রেলপথেও আগাম তল্লাশি চালানো হয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সমস্যাও দীর্ঘদিন ধরে সমাধান করা হচ্ছে না।

নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ড্রোন, হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান, অশ্বারোহী দল ও প্রশিক্ষিত কুকুরের ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়। প্যারিসের বিশেষ কিছু এলাকায় রাত ১১টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত বিধিনিষেধ এবং শঁজেলিজে এলাকায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাত ৯টার কারফিউ কার্যকর ছিল। লিওঁ, মার্সেই, তুলুজ ও বোর্দোর মতো শহরেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তুলুজে জলকামান ব্যবহার করে সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৩১ অক্টোবরের ঘোষণায় বলা হয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট, ড্রোন, হেলিকপ্টার, অশ্বারোহী দল, প্রশিক্ষিত কুকুরের ইউনিট, জেন্ডারম বাহিনীর ২৬টি সাঁজোয়া যান এবং জলকামান ছোড়ার ১৫ট।

মূলত গত মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ পরিবেশ, শিক্ষকের ঘাটতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে বৈষম্যের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। তাদের অভিযোগ, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ সমান নয়। তার অভিজ্ঞতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের আবাসনসংক্রান্ত সমস্যার একটি চিত্র তুলে ধরে। একজন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করা তার মায়ের দুরবস্থার প্রতি সংহতি জানাতে মিছিলে যোগ দেন।

পরে এতে আবাসনসংকট, ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট শ্রমিক ও বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ যুক্ত হন।

ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের কর্মীরাও সংহতি প্রকাশ করেছেন। সরকারি ছাত্রাবাসে থাকা শিক্ষার্থী কোরেন্তাঁ কাব্রু তার কক্ষের স্যাঁতসেঁতে দেয়াল ও ইঁদুরের উপদ্রবের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা মূলত পুরো শিক্ষাব্যবস্থারই প্রতিচ্ছবি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কোরেন্তাঁ কাব্রুর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি ছাত্রাবাসে বসবাসকারী এই শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তার কক্ষের দেয়ালের নিচের অংশে স্যাঁতসেঁতে দাগ, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়া এবং তেলাপোকা ও ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে।

পুলিশের কঠোর অবস্থান ও শান্তিপূর্ণ মিছিলে বিধিনিষেধ আরোপের ফলে আন্দোলনকারীরা এখন নাগরিক অধিকার ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়েও সোচ্চার হয়েছেন। বিক্ষোভকারী অ্যালিস হিয়েন জানিয়েছেন, শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে মিছিল সরিয়ে দেওয়াটা তাদের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ দাবি করেছেন, অনুমোদিত মিছিলগুলো শান্তিপূর্ণ হলেও অরাজকতাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাঁদানে গ্যাসের কারণে চোখ জ্বালা ও শ্বাসকষ্টে অনেক শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীও মিছিল ছেড়ে চলে যান।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু এরই মধ্যে শিক্ষার্থী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা কাটছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আগামী ৫ নভেম্বর থেকে নতুন করে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধ এবং ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ছয় মাসেরও কম সময় বাকি থাকায় এই আন্দোলন ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় প্রভাব ফেলছে। এদিকে, আলজাজিরার প্যারিস প্রতিনিধি নাতাশা বাটলার জানান, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বারবার রাজপথে নামা অনেক মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ফ্রান্স মন্দার ঝুঁকি ও সরকারি ঋণ কমানোর চাপের মুখে রয়েছে। এএফপি ও আলজাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে আন্দোলনকারীদের সব দাবি পূরণ করা সরকারের জন্য কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।