জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাস্তায় নেমেছেন তরুণেরা। প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলার পাশাপাশি আকাশচুম্বী আবাসন ব্যয়, নিম্ন মজুরি ও জলবায়ু সংকটের মতো অভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত তারা। কেবল ফ্রান্স বা গ্রিস নয়, বরং স্পেন, ইতালি, বেলজিয়াম ও জার্মানির মতো দেশগুলোতে লাখ লাখ তরুণ এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করছেন। প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও তাঁদের আস্থা কম। স্থানীয় বিভিন্ন অসন্তোষ এসব বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। তাঁদের কারও কারও হাতে ছিল গ্রিক ও ফরাসি ভাষায় লেখা স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড। আর অনেকের ক্ষেত্রে সেই চাকরিও অনিশ্চিত।’। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে তাঁদের পড়াশোনার পরিবেশ কতটা খারাপ হয়েছে, তা–ও বুঝতে পারছে। ২০১৮-১৯ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে এই আন্দোলন বড় ধরনের বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল। ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্ট কারা, কীভাবে তাঁদের আন্দোলন শুরু হলো।
ফ্রান্সে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে।
মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা সে সময় ভালো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্বচ্ছ পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানান। বুলুক নিজেও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।
সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসবিদ সিলভাঁ বুলুকের মতে, এটি একটি সুসংগঠিত ইউরোপীয় আন্দোলন হলেও ফ্রান্স এর অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেখানে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। শুরুতে বিক্ষোভ অনেকটাই শান্তিপূর্ণ ছিল।
গ্রিসের পরিস্থিতিও একই রকম। গত অক্টোবরের শেষের দিকে দেশটির বিভিন্ন শহরে ১০ হাজারের বেশি মানুষ রাজপথে নামেন। অ্যারিস্টটল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ফিলিপ্পোস আর্মেনের কথায়, পুরো ইউরোপ জুড়েই তরুণদের সমস্যাগুলো এখন প্রায় একই সুতোয় গাঁথা। ইতালিতেও শুক্রবারের বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের প্রতিবাদ জানানো কৃষকেরা ও যানবাহন চালকেরা। একই চিত্র পর্তুগালেও, যেখানে আবাসনের অধিকারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন। এসব বিক্ষোভে সামনের সারিতে রয়েছেন স্কুল-কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। জেন-জি বিক্ষোভে আবার উত্তাল ইউরোপ: ৩ দেশে সংঘর্ষ, ধরপাকড় ও লুটপাট। একইভাবে পর্তুগালে আবাসনের অধিকারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের তাঁবু খাটিয়ে অবস্থানের দৃশ্যও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে ভূমিকা রেখেছে। ‘এভাবে হাল ছেড়ে দেওয়া যায় না, রাজপথে ফিরতেই হতো’।
বেলজিয়ামের সমাজবিজ্ঞানী জিওফ্রে প্লেয়ার্সের মতে, ইউরোপের বর্তমান সমাজব্যবস্থা এখন কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। তিনি জানান, তরুণদের জন্য সম্মানজনক চাকরির সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে, উচ্চ আবাসন ব্যয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে বর্তমান প্রজন্মের জীবনযাত্রা তাদের অভিভাবকদের মতো নিশ্চিত নয়। গবেষণায় উঠে এসেছে, দারিদ্র্যের চেয়ে অনিশ্চয়তাই তরুণদের মধ্যে অসন্তোষের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব লুভাঁর সামাজিক আন্দোলনবিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘তরুণদের সামনে বড়জোর একটি চাকরির সুযোগ রাখা হচ্ছে।
মাদ্রিদের অটোনমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারিয়াম মার্তিনেস-বাসকুনানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ফ্রান্সের আন্দোলনের ঢেউ প্রতিবেশী দেশগুলোর তরুণদের উৎসাহিত করেছে। বিশেষ করে স্পেনে আবাসনের বিষয়টি আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া, জার্মানিতে রাশিয়ার সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা পুনরায় চালুর গুঞ্জন তরুণদের ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। জার্মানির ৩০টিরও বেশি শহরে জেন-জি প্রজন্মের এই বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। স্পেনের টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভিইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাদ্রিদের অটোনমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ফ্রান্সের বিক্ষোভের চিত্র অন্য দেশের তরুণদেরও উৎসাহিত করেছে।
বুলুকের মতে, তরুণদের মধ্যে নিজেদের ‘বলির পাঁঠা’ ভাবার তীব্র প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর পেছনে আগের প্রজন্মের রেখে যাওয়া বিশাল ঋণের বোঝা ও পরিবেশগত দায়ভার বড় কারণ। তিনি জানান, ফ্রান্সের শ্রেণিকক্ষে মুঠোফোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীরা একে অপরের সঙ্গে পুনরায় মেলামেশার সুযোগ পেয়েছে এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ফ্রান্সের শ্রেণিকক্ষে মুঠোফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার একটি অপ্রত্যাশিত প্রভাব দেখা গেছে।
রাজনৈতিক সচেতনতাও এই বিক্ষোভের একটি বড় দিক। আগামী এক বছরের মধ্যে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও গ্রিসে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার আগে তরুণদের এমন সক্রিয়তা জনমনে বড় ধরনের সাড়া ফেলেছে। প্লেয়ার্স সতর্ক করেছেন যে, রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দিন দিন দূরত্ব বাড়ছে কারণ মানুষ মনে করছে তাদের দাবিগুলো শোনার কেউ নেই। এছাড়া সচ্ছল পরিবারের তরুণদের চেয়ে আর্থিকভাবে অনিশ্চিত অবস্থার তরুণদের জীবন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে, যা সমাজে বৈষম্য ও অবিচারের অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ, এর সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সম্পদের ক্রমবর্ধমান অসম বণ্টনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্লেয়ার্স আরও বলেন, ‘যেসব তরুণের মা-বাবা সচ্ছল, তাঁদের জীবন তুলনামূলক স্বচ্ছন্দ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমাজে বৈষম্য ও অবিচার বেড়ে যাওয়ার অনুভূতি।



