রাজধানীর গুলশানে সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) শাম্মী আহমেদের বাসায় অভিযানের পর তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং ১০ লাখ টাকা আদায়ের মামলায় ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) ফিরোজ আহমেদ মুন্সী তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট আদালতে এই চার্জশিট দাখিল করেন। এভাবে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে কথিত সমন্বয়কেরা আদায় করেন ১০ লাখ টাকা। সংস্থাটির এসআই ফিরোজ আহম্মেদ মুন্সী তদন্ত শেষে গত ১৫ অক্টোবর ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। তখন ১০ লাখ টাকা আমাদের দেয়।’।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা আসামিরা হলেন আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ, জানে আলম অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও ইব্রাহিম হোসেন। মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অন্য আরেক আসামিসহ মোট ছয়জনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত সংস্থাটি। চার্জশিটে প্রধান আসামি আবদুর রাজ্জাক রিয়াদ ও জানে আলম অপুর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩৮৫ ও ৩৮৬ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও ইব্রাহিম হোসেনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮ ও ৩৮৫ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
পিবিআইয়ের তদন্ত নথিতে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী পরিচয়ে পরিচিতি তৈরি করেন। এই পরিচয়ের জেরে তাঁরা নিয়মিত বিভিন্ন থানায় যাতায়াত করতেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একাধিক মামলার আসামি ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও তাঁদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করে এবং নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে আসামিরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’, সমর্থক বা সহযোগী আখ্যা দিতে থাকেন। মামলা, গ্রেপ্তার ও পুলিশি হয়রানির হুমকি দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত চাঁদা দাবি ও আদায়ের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তাঁরা। ওই কার্যক্রমের মাধ্যমে আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে থাকে। ১০ নভেম্বর এই মামলার পরবর্তী দিন ধার্য আছে। তবে সর্বশেষ ১ নভেম্বর পর্যন্ত থানার জিআরে (সাধারণ নিবন্ধ শাখা) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযোগপত্রটি এখনো আদালতে জমা হয়নি।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই রাতে সাবেক এমপি শাম্মী আহমেদ তাঁর গুলশান-২-এর ৮৩ নম্বর সড়কের বাসায় অবস্থান করছেন এমন খবর পেয়ে আসামিরা নিজেদের সমন্বয়ক পরিচয়ে গুলশান-২ গোলচত্বরে জমা হন। পরদিন ১৭ জুলাই রাত আনুমানিক দুইটার দিকে আবদুর রাজ্জাক রিয়াদ ও জানে আলম অপু গুলশান থানায় গিয়ে পুলিশকে খবরটি জানান এবং তল্লাশি চালানোর অনুরোধ করেন। পুলিশ ও আসামিরা সমন্বিতভাবে বাসাতে গিয়ে অভিযান চালালেও শাম্মী আহমেদকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে একটি তল্লাশি তালিকা তৈরি করে পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। মামলাটি ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই গুলশান থানায় করেন সিদ্দিক আবু জাফর (৭৫)।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরে যাওয়ার পরপরই আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু পুনরায় সেই বাসায় প্রবেশ করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, বাসাটিতে থাকা সাবেক এমপির ৭৫ বছর বয়সী স্বামী সিদ্দিক আবু জাফরকে আসামিরা ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ হিসেবে ভয় দেখান। গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলার শর্ত হিসেবে তাঁর কাছে তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। লাগাতার হুমকির মুখে এবং আতঙ্কিত হয়ে তিনি নগদ ১০ লাখ টাকা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন।
পরবর্তী ঘটনাক্রমে ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে আসামিরা ফের ওই বাসভবনে গিয়ে দরজায় ধাক্কাধাক্কি করেন। গৃহকর্তা দরজা না খোলায় তাঁরা ফিরে যেতে বাধ্য হন। পিবিআই আসামিদের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে সে সময় ঘটনাস্থলে তাঁদের উপস্থিতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছে। এরপর ২৬ জুলাই বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে আবদুর রাজ্জাকসহ সহযোগীরা আবার ওই বাসার সামনে যান। ওই সময়ে বাদী বাসায় ছিলেন না, তবে সিকিউরিটি গার্ড মো. হান্নান ফোনে বিষয়টি তাঁকে জানালে তিনি সঙ্গে সঙ্গে গুলশান থানায় তথ্য দেন। পুলিশ দ্রুত অভিযানে গিয়ে আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও ইব্রাহিম হোসেনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। পরে এই চক্রের অপর সদস্য জানে আলম অপুকেও গ্রেপ্তার করা হয়। আটককালে আবদুর রাজ্জাকের কাছ থেকে বিভিন্ন বিবরণসংবলিত সোয়া দুই কোটি টাকার চেক জব্দ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। কয়েক দিন পর বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন পাঁচজন। তিনি বলেন, ‘আসামিদের একজন শিশু হওয়াই তার বিচার হবে শিশু আদালতে। থানা-পুলিশ বিষয়টি গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে জানায়। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনার বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, ১৭ জুলাই ভোরে গুলশান থানার এসআই আরমান আলীর নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশের সদস্য এবং আবদুর রাজ্জাক, জানে আলম অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন, আমিনুল ইসলামসহ আরও ১০ থেকে ১২ জন ওই। পরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহায়তায় তাঁকেও গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার ছয়জনের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মূল অভিযুক্ত আবদুর রাজ্জাক চাঁদার টাকা আদায়ের সত্যতা মেনে নেন। নিজেকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক বলে দাবি করে তিনি জানান, ফ্যাসিবাদী সরকারের লোকদের ধরিয়ে দিতে তিনি পুলিশকে নানা সময় সহায়তা করেছেন। জবানবন্দিতে রিয়াদ দাবি করেন, ১৭ জুলাই অভিযানের সময় জানে আলম অপু বাসা থেকে সাবেক এমপির নাম লেখা একটি ইয়ারপড নিয়ে এসেছিলেন এবং সেটি ফেরত দিতেই তাঁরা পরে ওই বাসায় যান। বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে ২৬ জুলাই সহযোগীদের পাঠানোর বিষয়ে রিয়াদ দাবি করেন, পুলিশ ফাঁদ পেতে তাঁকে বাসায় যেতে বলেছিল। শেষ অংশে নিজের অপরাধ স্বীকার করে রিয়াদ বলেন, তিনি গরিবের ছেলে হওয়ায় টাকার লোভ সামলাতে পারেননি এবং আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
অন্য আসামি জানে আলম অপুর দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও টাকা আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। অপু জানান, তিনি একটি কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৭ জুলাই রাতে খবর পেয়ে তাঁরা গুলশানের বাসায় যান। পরবর্তীতে রিয়াদ তাঁকে নিয়ে আবার বাসায় ঢোকেন এবং ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। দীর্ঘ রফাদফার পর বাদী ১০ লাখ টাকা দিতে রাজি হন। সেই টাকা নিয়ে আসামিরা বাড্ডায় রিয়াদের বাসায় গিয়ে সমপরিমাণে পাঁচ লাখ টাকা করে ভাগ করে নেন। অপু নিজের অংশের ৩ লাখ ৭ হাজার টাকা দিয়ে একটি ইয়ামাহা এফজেড-এক্স মোটরসাইকেল কেনেন, কিছু দেনা পরিশোধ করেন এবং ভুল বিকাশ নম্বরে ৫০ হাজার টাকা পাঠান। পরবর্তীতে তল্লাশি চালিয়ে অপুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোটরসাইকেল, আইফোন ১১ ও তাঁর কাছে থাকা নগদ ১৭ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। অন্যদিকে আবদুর রাজ্জাকের বাড্ডার বাসা থেকে নগদ ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ও তিনটি দামি স্মার্টফোন (রেডমি নোট ১০ প্রো ও দুটি আইফোন ১৩) জব্দ করে পুলিশ। অপু পানি খাওয়ার অজুহাতে ভেতরে ঢোকেন। দীর্ঘ আলোচনার পর ৫০ লাখ টাকায় বিষয়টি ঠিক হয়। বাদী ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তাঁরা তাতে রাজি হন।
মামলার বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী আকরাম হোসাইন জানান, তাঁরা চার্জশিটটি এখনও বিশদভাবে পর্যালোচনা করেননি এবং আদালতের কাছে প্রয়োজনীয় পিটিশন দাখিল করবেন। জামিনে থাকা আবদুর রাজ্জাক রিয়াদের বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সেটি তাঁর ভাই মো. রেজাউল করিম রিসিভ করেন। রেজাউল করিম জানান, মামলার বিষয়ে তাঁর ভাই রিয়াদ এই মুহূর্তে গণমাধ্যমের সামনে কোনো মন্তব্য করতে ইচ্ছুক নন।
আদালতের সার্বিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করে মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন জানান, সমন্বয়ক পরিচয়ে অরাজকতা ও চাঁদাবাজি চালানো আবদুর রাজ্জাক রিয়াদই ছিল এই অপকর্মের মূল হোতা। পুলিশি তদন্ত শেষে অভিযুক্ত সব অপরাধীকে চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং আদালত ও বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে রাষ্ট্রপক্ষ কাজ করবে। একইসঙ্গে মামলার বাদী সিদ্দিক আবু জাফরের আইনজীবী জহুরুল আলম পিবিআইয়ের তদন্ত ও অভিযুক্ত ধারাসমূহে চার্জশিট দাখিলে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।



