যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টিকে পেছনে ফেলে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়েছে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি। এর ফলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছর আইন প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়নে চরম বাধা ও জটিলতার মুখে পড়বে।
২০২৬ সালের এই নির্বাচনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষ। দেশে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ, ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অজনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা এই অভাবনীয় জয় নিশ্চিত করেছে। গত আধা শতকে মাত্র দুইবার একই নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ এক দল থেকে অন্য দলের কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার ঘটনা ঘটল। গত ৫০ বছরে মাত্র দুবার একই নির্বাচনি চক্রে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ এক দল থেকে অন্য দলের হাতে গেছে।
সিএনএনের ডিসিশন ডেস্কে প্রকাশিত পূর্বাভাস ও জরিপ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের এই জয় কেবল প্রতিনিধি পরিষদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সিনেটেও বড় রদবদল ঘটিয়েছে। রিপাবলিকানদের বহু বছরের দুর্গ হিসেবে পরিচিত কয়েকটি রাজ্যেও বিজয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। এর মধ্যে রয়েছে সাউথ ক্যারোলাইনা, টেক্সাস, ওহাইও, কানসাস এবং আইওয়া। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাউথ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্প ১৮ শতাংশ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে জিতেছিলেন। অন্যদিকে, টেক্সাসে ১৯৯৪ সালের পর এবং কানসাসে ১৯৩২ সালের পর এবারই প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেটর নির্বাচিত হলেন। কানসাসেও সর্বশেষ ১৯৩২ সালে ডেমোক্র্যাটদের কোনো প্রার্থী সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন। এত দিন রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসে তার প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো তুলনামূলক কম বাধার মুখে পড়েছে।
নির্বাচনকালীন ভোটার জরিপ থেকে স্পষ্ট যে, অর্ধেকেরও বেশি বা ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের বেশি আমেরিকান ট্রাম্পের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অংশগ্রহণকারী ভোটারদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মনে করেন, ট্রাম্পের গৃহীত অর্থনৈতিক নীতির কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অবনতি ঘটেছে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের মাত্র তিনটি অতিরিক্ত আসনের প্রয়োজন ছিল, যা সহজেই অর্জিত হয়। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ লাভ করা ছিল সবচেয়ে বড় চমক, কারণ এখানে ট্রাম্পের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত একাধিক রাজ্য জয় করতে হয়েছে তাদের।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে এখন কঠোর জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। ডেমোক্র্যাটরা এখন প্রশাসনিক নানা সিদ্ধান্ত ও কেলেঙ্কারির তদন্ত শুরু করার সুযোগ পাবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের তলব করতে সমন জারির আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। পাশাপাশি সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে এসেছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টে বিচারকের পদ খালি হলে সেখানে ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীকে আটকানো তাদের পক্ষে সম্ভব হবে।
অবশ্য কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও নিজেদের ইচ্ছেমতো আইন প্রণয়ন করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য খুব সহজ হবে না। প্রেসিডেন্ট হিসেবে যেকোনো বিলে ভিটো দেওয়ার ক্ষমতা ট্রাম্পের রয়ে গেছে। তাছাড়া সিনেটে যেকোনো সাধারণ আইন পাসের জন্য অন্তত ৬০টি ভোটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে আগামী দুটি বছর ট্রাম্প প্রশাসন ও ডেমোক্র্যাটদের তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত ও আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই অতিবাহিত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, সিনেটে অধিকাংশ আইন পাসের জন্য ৬০ ভোট প্রয়োজন।



