মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিশাল জয়, চাপে ট্রাম্প

, বিশ্ব

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিশাল জয়, চাপে ট্রাম্প

মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ব্যাপক সাফল্য বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারার প্রতি ভোটারদের তীব্র অসন্তোষ ও প্রত্যাখ্যানের বার্তা দিয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো ভোটাররা এত বড় পরিসরে ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। এই নির্বাচনী ঢেউ রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভোট ব্যাংককে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। দুবার ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে পৌঁছে দেয়া ভোটার জোটের ওপরও তাঁর আগের মতো নিয়ন্ত্রণ আর নেই। রিপাবলিকানদের হটিয়ে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিল ডেমোক্র্যাটরা। এতে দুর্নীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ আরো বেড়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ নভেম্বর বুধবার প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারাভিযানের সময় ট্রাম্প ভোটারদের বারবার আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন তারা ভোট প্রদানের সময় তাকেই মাথায় রাখেন। চলতি বছরের শরতের শুরু থেকে অন্তত ৪৭ বার তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘এমনভাবে ভোট দিন যেন ব্যালটে আমারই নাম আছে।’ মূলত নিজের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের জন্য তিনি এই নির্বাচনকে একটি গণভোটের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। অথচ এসব উদ্যোগ নিয়ে ভোটারদের বিরক্তির লক্ষণ আগেই দেখা যাচ্ছিল।

পিটার বেকার তার ‘হিস্টোরিক মিডটার্ম রাউট সার্ভস আ সুইপিং রিপিউক অব ট্রাম্প এরা’ শীর্ষক বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ১৯৮৬ সাল থেকে তিনি অনেক নির্বাচন কভার করেছেন, কিন্তু ট্রাম্পের মতো কোনো প্রেসিডেন্ট মধ্যবর্তী নির্বাচনকে নিজের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে তুলে ধরেননি। প্রতিনিধি পরিষদের আসনগুলোর জন্য জাতীয়ভাবে ডেমোক্র্যাটদের ভোটের ব্যবধান প্রায় ১৩ শতাংশ হতে পারে বলে বুধবার ভোর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে ধারণা করা হচ্ছে। ১৯৭৬ সালের পর থেকে কংগ্রেসের কোনো নির্বাচনে কোনো দলের জন্য এটি বিরল ও বিশাল ব্যবধান। এখন সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হচ্ছে তাঁকে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের হিসাব বলছে, অন্তত ১৯৭৬ সালের পর কংগ্রেস নির্বাচনে কোনো দল এত বড় ব্যবধানে জয় পায়নি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে নতুন ঊর্ধ্বগতি। তবে নির্বাচনে ভরাডুবির পরপরই নিজের অবস্থান সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন ট্রাম্প।

নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায়, জ্বালানির উচ্চমূল্য, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক এবং ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণের অভিযোগ ভোটারদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিল ক্লিনটনের শাসনামলে ১৯৯৪ সালে কিংবা বারাক ওবামার আমলে ২০১০ সালে রিপাবলিকানরা যে বড় জয় পেয়েছিল, এবারের ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান তার চেয়েও অনেক বেশি। যদিও নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে এই ভোটের ব্যবধান আসন সংখ্যায় পুরোপুরি প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা কম। নিজেদের সুবিধামতো নির্বাচনী এলাকার সীমানা সাজিয়ে নেয়ায় এখন বিরোধী দলের পক্ষে অন্য দলের আসন কেড়ে নেয়া আগের চেয়ে কঠিন। তুলনামূলক বেশি জয়ের সম্ভাবনা থাকা প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তিনি কেন প্যাক্সটন ও ডারলিন গ্রাহামকে বেছে নিয়েছিলেন, এখন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

ট্রাম্প অবশ্য এই পরাজয়কে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে মানতে নারাজ।

মঙ্গলবার রাতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ‘আমি তো ব্যালটে ছিলাম না, তাই পর্যাপ্ত ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি।

তার এই বক্তব্য নিয়ে রিপাবলিকান দলের ভেতরেই অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, কারণ এবারের পুরো নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিলেন স্বয়ং ট্রাম্প। তাঁর এই বক্তব্য শুনে অনেক রিপাবলিকানও বিরক্তি প্রকাশ করবেন। তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব তৈরির সাহস অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী দেখাতে পারেননি।

সাবেক ডেমোক্র্যাট মেয়র এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত রাহম ইমানুয়েল মনে করেন, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো—ট্রাম্পের ‘মাগা’ (MAGA) মতাদর্শে বিশ্বাসী নন এমন রিপাবলিকান ভোটাররা দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা মানুষদের বিরুদ্ধে কঠোর ধরপাকড় দেখে তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

নির্বাচনের পরদিন থেকেই মার্কিন রাজনীতি নতুন এক সন্ধিক্ষণে প্রবেশ করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডগলাস বি. সোসনিক। তিনি বলেন, আগামী দুই বছর হতে যাচ্ছে ব্যাপক পরিবর্তনের সময়। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দের প্রার্থীদের পরাজয় তার হস্তক্ষেপে সৃষ্ট সংকটেরই প্রতিফলন। অনেক ভোটার জানিয়েছেন যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো এবং নতুন যুদ্ধ থেকে দেশকে বিরত রাখার যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা পূরণ না হওয়ায় তারা হতাশ। রিপাবলিকানদের হারে ইরান যুদ্ধের প্রভাব স্বীকার করলেন ট্রাম্প। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা একজন বহিরাগত নেতার ওপর যারা একসময় আস্থা রেখেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এবার তাঁর দলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ছাড়া ক্ষমতায় থেকে নিজের অর্থ উপার্জনের নৈতিকতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নও তিনি এড়িয়ে গেছেন। ভোক্তাদের খরচ বাড়িয়ে দেয়া শুল্কনীতির বিরুদ্ধেও তাঁদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটনে নিজের পছন্দের নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে তাঁর অতিরিক্ত আগ্রহের বিষয়টি আবারো সামনে আসে। সৌদির সঙ্গে আলোচনা, বিদেশি সেনামুক্ত মধ্যপ্রাচ্য চায় ইরান।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিন ভ্যাভরেকের মতে, এটি কেবল ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাসের লক্ষণ নয়, বরং মানুষ তার রাজনীতির প্রতি আগের মতো আর আগ্রহী নয়। তবে ট্রাম্পের উপদেষ্টা জো গ্রোগানের দাবি, নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির ধরন চিরতরে বদলে দিয়েছেন। তার মতে, রিপাবলিকান পার্টি আর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা এখনো ট্রাম্পের দলেই আছি। যারা মনে করছেন ট্রাম্পবাদ শেষ হয়ে গেছে, তারা ভুল করছেন।’ এক দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি নিতে চায় ভারত। জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ কমানোর পরিকল্পনার কথা বলার বদলে তিনি ওয়াশিংটনের রিফ্লেক্টিং পুলের সামনে দাঁড়িয়ে শেওলা ও পানির পাইপ নিয়ে কথা বলেন।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭৪ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পরও রিপাবলিকানরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।

একইভাবে ১৯৯৪ ও ২০১০ সালের নির্বাচনে বড় জয়ের পর ক্লিনটন ও ওবামা তাদের ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছিলেন। সে কারণেই বর্তমানে ডেমোক্র্যাটদের এই বিশাল জয় আগামী দুই বছরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবশিষ্ট মেয়াদে বড় ধরনের রাজনৈতিক নাটকীয়তার সূচনা করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। দলটির মূলনীতিতে ফিরে গিয়েই কেবল ২০২৮ সালের নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন ক্লাব ফর গ্রোথের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যাকিনটোশ।