সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ২০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে এক ব্যক্তি পাথরের ওপর আটকা পড়েছেন এবং একটি হাতি পানির স্রোতে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে নিরাপদে নিয়ে আসছে। ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, ‘নেপালে বন্যার তীব্র স্রোতে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করল বন্য হাতি।’ অনেক ক্ষেত্রে এটিকে ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সময়ের দৃশ্য হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
তবে যাচাই-বাছাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগের নয়। ওই দুর্যোগের অন্তত ১৮ দিন আগেই একই ভিডিও অনলাইনে পাওয়া গেছে। গত ২৭ আগস্ট ‘সংবাদ প্রতিদিন ২৪’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়, যা প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশিবার দেখা হয়েছে এবং ৭ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। এছাড়া ‘Gazi Babl’, ‘Sowrov Ahmed’ ও ‘David J Harris Jr.’-এর মতো বিভিন্ন প্রোফাইল ও পেজ থেকেও একই দাবিতে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়েছে, যেখানে মোট ভিউয়ের সংখ্যা ৫৬ লাখ ছাড়িয়েছে। ‘Tony Gunk’ নামের একটি এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকেও ভিডিওটি ৮ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে।
ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে দেখা যায়, এটি ৮ আগস্ট থেকেই ইন্টারনেটে বিভিন্ন ক্যাপশনে প্রচারিত হচ্ছে। ভারতীয় নিউজ পোর্টাল ‘বাংলা হান্ট’সহ একাধিক প্ল্যাটফর্মে সে সময় ভিডিওটি পাওয়া গেছে। কোথাও এটিকে আসামের বন্যার দৃশ্য, আবার কোথাও পোষা হাতির সাহায্যে মালিককে উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’ এবং বাংলাদেশের ‘নাগরিক প্রতিদিন’-এর ইউটিউব চ্যানেলেও ৯ আগস্ট একই ভিডিওর দীর্ঘ সংস্করণ পাওয়া যায়। ‘দ্য ওয়্যার ইন্ডিয়া’ ও ‘সঞ্জয় পেরা নিউজ’-এর মতো পেজগুলো থেকেও সে সময় ভিডিওটি পোস্ট করে সেটিকে আসামের বন্যার দৃশ্য বলে দাবি করা হয়েছিল।
ভিডিওটির প্রেক্ষাপট ও প্রচারের সময়রেখা
- ৮–৯ আগস্ট: ভিডিওটি ভারত ও বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্যাপশনে ছড়ায়। কোথাও এটিকে আসামের বন্যার দৃশ্য বলা হয়, আবার কোথাও শুধু হাতির সাহায্যে মানুষ উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
- ২৭ আগস্ট: এর আগে থেকেই অনলাইনে থাকা একই ভিডিও নতুন করে ‘নেপালের বন্যায় হাতি মানুষকে উদ্ধার করেছে’ দাবিতে ছড়িয়ে পড়ে।
- পর্যবেক্ষণ: নতুন একটি দুর্যোগের সঙ্গে পুরোনো ভিডিওকে যুক্ত করে প্রচারের মাধ্যমে ভিডিওটির প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করা হয়েছে।
যদিও আসামের বন্যার সঙ্গে ভিডিওটির যোগসূত্র দাবি করা হয়েছে, তবে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্যপ্রমাণে এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভিডিওটির দৃশ্যগুলো পর্যালোচনা করলে হাতির শুঁড় বেয়ে ব্যক্তির ওঠা এবং নড়াচড়ার ভঙ্গিতে কিছুটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। ‘Hive Moderation’-এর এআই শনাক্তকরণ টুল ভিডিওটিকে ৭৫ শতাংশ এআই-নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা নির্দেশ করেছে। তবে কেবল এই টুলের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো না গেলেও, এটি নিশ্চিত যে ভিডিওটি নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার ঘটনা নয়।
নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসকে কেন্দ্র করে আরও কিছু পুরোনো ভিডিও বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে তীব্র স্রোতে মানুষকে চিৎকার করতে দেখা যায়, যা আসলে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট ভারতের উত্তরাখন্ডের উত্তরকাশী জেলায় ঘটে যাওয়া আকস্মিক বন্যার দৃশ্য। এছাড়া ‘নেপালে ভয়াবহ বন্যা, চোখের পলকে মানুষসহ তলিয়ে গেল পুরো ভবন’ দাবিতে প্রচারিত আরেকটি ভিডিও আসলে চলতি বছরের জুলাই মাসে জম্মু-কাশ্মীরে ঘটে যাওয়া দুর্যোগের চিত্র। এসব ভিডিওর সঙ্গে নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাড়ের কাছাকাছি বড় একটি পাথরখণ্ডের ওপর থাকা এক ব্যক্তি ভেসে যাওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পানির প্রবল স্রোত যেকোনো সময় তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমন পরিস্থিতিতে পাশে থাকা লোকজনের চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে দেখা গেল, একটি হাতি পানির স্রোতের মধ্যে গিয়ে ওই ব্যক্তিকে নিরাপদে সরিয়ে আনছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব পোস্টে ঘটনাস্থল হিসেবে সরাসরি ‘আসাম’ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পোস্টে ‘Assam Floods’ হ্যাশট্যাগও ব্যবহার করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ ওই বন্যায় মৃত মানুষের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায় এবং প্রায় তিন লাখ মানুষ ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেয়।



