মিরাজুল ইসলাম অর্ণব। শরীয়তপুর নড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা। জুলাই আন্দোলনের ৪ মাস আগে থেকেই ঢাকার একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি নেন অর্ণব। থাকতেন মোহাম্মদপুরের বসিলা ওয়েস্ট ধানমণ্ডি হাউজিংয়ে। ১৯শে জুলাই জুমার নামাজ শেষ করে আন্দোলনে যোগ দেন অর্ণব। সেদিন পতিত শেখ হাসিনার নির্দেশে পুরো মোহাম্মদপুর র্যাবের বিশেষ হেলিকপ্টার টিম দায়িত্ব পালন করে। বসিলায় র্যাবের হেলিকপ্টার টিমের তাণ্ডব দেখা যায়। বিকালে র্যাব-২ সদর দপ্তরের সামনে ছাত্র-জনতা ভিড় করেন। ইটপাটকেল ছোড়েন। র্যাবও আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয়। বিকালে বসিলা ব্রিজের ঢালে গুলিতে নিহত হন অর্ণব। ঘটনার দুই মাস পর অজ্ঞাতনামা শতাধিক আসামি করে আদালতে মামলা করেন নিহত অর্ণবের মা। আদালত মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)কে তদন্তের দায়িত্ব দেন। চব্বিশের নভেম্বর থেকে মামলাটির তদন্ত করছেন পিবিআই’র শ্যামলী অফিসের পুলিশ পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম। জানতে চাওয়া হলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, অন্য মামলায় কিছু আসামির নাম থাকে আর কিছু অজ্ঞাতনামা আসামি থাকে। কিন্তু এই মামলাটিতে সব আসামি অজ্ঞাত। যা মামলার সঙ্গে মিল আছে। সাক্ষী ও আসামি খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত প্রতিবেদন দিতে পারছি না। তাতে যতদিন সময় লাগে ততদিনই অপেক্ষা করতে হবে। একইদিনে বসিলা উত্তরপাড়ার মো. মনসুরও বসিলা ব্রিজের নিচে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ওই বছর সেপ্টম্বরের শেষ দিকে র্যাবের হেলিকপ্টার টিমসহ পুলিশ ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন নিহত মনসুরের বড়ভাই আয়নাল হক। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
জুলাই আন্দোলনে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অঙ্গহানি ও মানবতাবিরোধী মামলাগুলো তদন্ত করছেন পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই, ডিবি, এটিইউ, প্রসিকিউশন ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন সংস্থা। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে মামলার তদন্তে ধীরগতি হওয়ার কিছু কারণ জানা গেছে। তারা বলছেন, আন্দোলনের পর একই ঘটনার বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে একাধিক মামলা হয়েছে। আবার অধিকাংশ ঘটনাস্থলে সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবি আসল নাকি তা যাচাই করতে সময় লাগছে। প্রতিটি ভিডিও’র উৎস, সময় ও স্থান নিশ্চিত করতে সময়সাপেক্ষ। ব্যবহৃত গুলি, অস্ত্র, ডিএনএ, ময়নাতদন্তের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে অতিরিক্ত সময় লাগছে। এসব প্রতিবেদন আদালতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যা তদন্তকে দীর্ঘায়িত করছে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত সূত্রে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের পর সারা দেশে ৮০১টি হত্যা মামলা হয়। এ ছাড়া হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য অভিযোগে ১ হাজার ৬৪টি মামলা হয়। এসব মামলায় আসামি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩১ জন। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট পর্যায়ক্রমে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায়। প্রায় দুই বছর শেষে মাত্র ২৫৯টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, মোট মামলার মাত্র ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশের তদন্ত শেষ হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং চার্জ গঠনের শুনানি চলছে। বাকি মামলাগুলো এখনো তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। যেসব মামলায় পুলিশ এখনো অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয়নি, সেগুলোর বিচার শুরু হয়নি। বিচার শুরু করতে সাধারণত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল, আদালতের অভিযোগ গঠন এবং এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে জুলাই আন্দোলনে আদালতে দায়ের হওয়া ৮২টি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান পিবিআই। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশে অতিরিক্ত ১৯৭টি সিআর মামলার তদন্ত করে সংস্থাটি। এগুলোর মধ্যে হত্যা মামলা ৮৯টি, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য অভিযোগে মামলা ১৯০টি। গত ২১শে জুলাই পর্যন্ত মোট ২০৮টি মামলার তদন্ত শেষ করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে হত্যা মামলার সংখ্যাই বেশি। ঢাকার ৫০টি থানা ও আদালতে দায়ের হওয়া অসংখ্য হত্যা মামলার ক্ষেত্রে অধিকাংশ এখনো তদন্তাধীন। তদন্তের এই দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। তবে তদন্তকারী সংস্থাগুলো দাবি করছে, প্রতিটি মামলার সত্যতা যাচাই এবং প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করতে তারা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এডভোকেট মো. ওমর ফারুক ফারুকী মানবজমিনকে বলেন, বেশকিছু জুলাই-সংক্রান্ত মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা হয়েছে। দ্রুতই আদালতে এসব মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হবে। আমরা আদালতকে অভিযোগ গঠনের আর্জি জানবো। দু’টি মামলার চার্জ শুনানিও শুরু হয়েছে। দেখা যাচ্ছে মামলায় নির্দোষ ব্যক্তি যেমন আসামি হয়েছেন, তেমনি দোষী ব্যক্তিও বাদ পড়েছেন। তদন্তের এই পর্যায়ে এসে নির্দোষদের অব্যাহতি এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিচার বিভাগ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন।
পিবিআই (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) এর পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ বলেন, কিছু এজহারে ভিকটিম যে স্থানে আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে আসলে ভিকটিম যাননি। অথবা ভিকটিম সেখানে গেলেও আহত হননি। এসব কারণে তদন্ত পরিস্থিতি জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে। অধিকাংশই হত্যা মামলা। সে কারণে লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের ব্যাপার আছে। এসব করতেও সময়ের প্রয়োজন হয়। এছাড়া ফরেনসিক রিপোর্ট এবং ব্যালিস্টিক পরীক্ষার ফলাফল পেতেও বিলম্ব হচ্ছে। সব মিলিয়ে জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া একটি দীর্ঘ ও জটিল আইনি পথের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।
শুধু অর্ণব আর মনসুরের মামলাই নয়, জুলাই আন্দোলনে হত্যা এবং হত্যাচেষ্টার ৮৮ শতাংশ মামলাই এখনো তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে।
একজন তদন্তকারী কর্মকর্তার কাঁধে গড়ে ১০টিরও বেশি মামলা দায়িত্ব থাকায় তারা হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
এ ছাড়া মামলাগুলো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় তদন্তে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও প্রমাণের মান নিশ্চিত করার উপর বাড়তি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
তাই আসামি খুঁজে পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তবে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিয়েছি।
প্রবাসী, জীবিত-মৃত ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়।
এতে প্রকৃত দায় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি, ভিডিও, মোবাইল লোকেশন ও ডিজিটাল ফরেনসিকের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য সংগ্রহে সমস্যা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ায় অনেকে সাক্ষ্য দিতে চাইছে না।
অনেকে সাক্ষী ভীত, কেউ এলাকা ছেড়েছেন, আবার কারও বক্তব্যে অসঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছে।
তদন্তে তাড়াহুড়া করে অভিযোগপত্র দিলে আদালতে তা টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে।
তাই তদন্তকারী কর্মকর্তারা গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
হাসপাতালেও গুরুত্বপূর্ণ নথি সম্পূর্ণ নেই।
এতে মৃত্যুর কারণ ও আঘাতের ধরন আদালতে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সঠিক তদন্তে তিনি সবকিছু বের করতে পারবেন।
সূত্র: মানবজমিন



