বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ২৫ মিলিয়ন ডলারের একটি বড় অংশের সন্ধান পেয়েছিল যুক্তরাজ্যের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এনসিএ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা। এই বিশাল অংকের অর্থ যুক্তরাজ্যে জব্দ করার পর বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা চেয়েছিল এনসিএ। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে না পারায় এই অর্থ উদ্ধারের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে বাংলাদেশের। চার সপ্তাহের আইনি বাধ্যবাধকতা শেষ হওয়ার পর ওই অর্থ লন্ডন থেকে কৌশলে দুবাইয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের জানুয়ারিতে, যখন এনসিএ বাংলাদেশের কাছে ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর যুক্তরাজ্যে থাকা অর্থের বিষয়ে তথ্য জানায়। ৯ই ফেব্রুয়ারি এনসিএ একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জানায়, ইউবিএস এজি লন্ডন শাখায় শওকত আলীর নামে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার গচ্ছিত আছে। তৎকালীন সময়ে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে বিভিন্ন তদন্ত চলছিল।
যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, বিএফআইইউ যদি দ্রুত অপরাধের যোগসূত্র এবং দেশে সম্পদ জব্দ করার মতো আইনি ভিত্তি প্রমাণ করতে পারতো, তবে যুক্তরাজ্যের আদালতের মাধ্যমে অর্থটি আটকে রাখা সম্ভব ছিল। তবে এনসিএ’র ধারাবাহিক অনুসন্ধানের জবাবে বিএফআইইউ কোনো দৃশ্যমান আইনি সফলতা দেখাতে পারেনি। ১৯শে ফেব্রুয়ারি এনসিএ স্পষ্ট জানায়, যুক্তরাজ্যে অর্থ আটকে রাখার প্রাথমিক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশের অবস্থান জানা প্রয়োজন।
২২শে ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউ জানায় যে, শওকত আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্ত চলছে। তবে সেই তদন্তগুলো তখন অনুসন্ধান পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে পাচারকৃত অর্থের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের সরাসরি যোগসূত্র তারা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। এছাড়া দেশে শওকত আলীর কোনো সম্পদ তখন পর্যন্ত আদালত কর্তৃক ক্রোক বা জব্দ করা হয়নি।
২৫শে ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউ জানায়, শওকত আলী দেশে নেই এবং বিভিন্ন সংস্থা যেমন এনবিআর, সিআইডি ও দুদক তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। কিন্তু এনসিএ’র প্রয়োজন ছিল কার্যকর আইনি পদক্ষেপের প্রমাণ। আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অপারেশনাল ব্যবস্থার অভাবও এই প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২৩শে ফেব্রুয়ারি এনসিএ কর্মকর্তা ইয়ান পোর্টার জানান, গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির জন্য প্রয়োজনীয় ওএসজেএ ব্যবস্থা অনুমোদিত না থাকায় তথ্য আদান-প্রদানে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
২৭শে ফেব্রুয়ারি এনসিএ চূড়ান্ত বার্তা দেয় যে, তাদের কাছে এখন আর এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যদিও বাংলাদেশ তখনও মামলা দায়ের করে অভিযোগপত্র দিতে পারতো, কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের ওই সময়ে কার্যকর আইনি ভিত্তি তৈরিতে বিএফআইইউ পিছিয়ে ছিল। মার্চ মাসে তারা শওকত আলীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের অভাব এবং কর দাবির কথা জানায়। তবে যুক্তরাজ্যে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের বিধি ১৯৭৯ সালেই বিলোপ হওয়ায় এই যুক্তিটি কাজে আসেনি।
উল্লেখ্য, শওকত আলী চৌধুরীর অর্থ লন্ডনে প্রায় চার সপ্তাহ আটকে ছিল। এই সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ অর্থটি ছেড়ে দেয় এবং পরবর্তীতে তা দুবাইয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশ থেকে গড়ে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। বর্তমান সরকার বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বিভিন্ন দেশের সাথে আইনি সহায়তার প্রক্রিয়া জোরদার করছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংস্থাটির সঙ্গে এনসিএ’র পক্ষ থেকে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সে সময় তার ব্যাংক হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখন দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুসন্ধানে তার দেশ-বিদেশের সম্পদ, ব্যবসায়িক লেনদেন, কর নথি এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে ওই অর্থের সঙ্গে বাংলাদেশে চলমান অপরাধের যোগসূত্র কী, তাও জানতে চাওয়া হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এনবিআর’র তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন যৌথ কর কমিশনার মোহাম্মদ দাউদ হোসেন, সিআইডি’র পরিদর্শক গোলাম সরোয়ার এবং দুদকের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই জবাবে বিএফআইইউ জানায়, ২০২৫ সালের ১লা জুলাই থেকে ২৯শে আগস্ট পর্যন্ত শওকত আলীর হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়।



