হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত এবং সরকারি কাজে বাধার অভিযোগে করা মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তী সময়ে তাকে বিমানবন্দর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, বিমানবন্দর থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার প্রেক্ষিতে গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করেছে। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল হাসান তালুকদার জানান, আসামির বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, আঘাত, অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। গ্রেপ্তারের আগে যা বললেন আখতারুজ্জামান এদিকে গ্রেপ্তারের সময়ে ফেসবুক লাইভে আসেন আসেন মেজর (অব।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ১লা অক্টোবর সকাল ১০টা ১০ মিনিটে, যখন মদিনা থেকে আসা ফ্লাইট বিজি-৩৩৮ এর যাত্রীদের ট্রলি সংকট ও লাগেজ পেতে দেরি হওয়া নিয়ে বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের অনুরোধে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ পরিস্থিতি শান্ত করতে সেখানে উপস্থিত হন। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, এ সময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান উত্তেজিত হয়ে নির্বাহী পরিচালকের দিকে তেড়ে যান এবং তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’ ও ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’ বলে হুমকি দেন। এ সময় তিনি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী নিয়েও অশালীন মন্তব্য করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়, ১লা অক্টোবর সকাল ১০টা ১০ মিনিটে মদিনা থেকে আগত একটি ফ্লাইটের (বিজি-৩৩৮) যাত্রীদের ব্যাপক চাপের কারণে ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলি সংকট দেখা দেয় এবং লাগেজ পেতে বিলম্ব হয়। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আস্সালামু আলাইকুম।
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা প্রটোকল সহকারীরা সংরক্ষিত এলাকায় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ শুরু করলে নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তাদের বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মেজর আখতারুজ্জামান তাকেও গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এছাড়া তিনি যাত্রীদের সংগ্রহ করা পবিত্র জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলে দেন এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন। এই ঘটনায় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজীব বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে বিমানবন্দর থানায় মামলাটি দায়ের করেন। বাদীর ভাষ্যমতে, এই কর্মকাণ্ড বিমানবন্দরে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
গ্রেপ্তারের ঠিক আগমুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি লাইভ ভিডিওতে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান দাবি করেন, তিনি জনগণের অধিকার ও প্রবাসীদের কল্যাণে লড়াই করছেন। তিনি ভিডিওতে বলেন, যদি জনগণের জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে তাকে জীবন দিতে হয়, তবে তিনি প্রস্তুত। তার ভাষ্যমতে, তিনি জনগণের পাশে ছিলেন এবং সবসময় থাকবেন। তার এই গ্রেপ্তার ও মামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি অবিলম্বে আখতারুজ্জামানের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন। আল্লাহ যেন আমার সেই দাবি কবুল করেন। প্রিয় দেশবাসী, সবাই ভালো থাকবেন, সুখে থাকবেন। সবাই দোয়া করবেন, আমি যেন জনগণের জন্য, দেশের মানুষের জন্য বিশেষ করে প্রবাসী মানুষ রক্ষার জন্য যদি শহীদ হতে পারি। জনগণের অধিকারের সংগ্রামে আমি আছি এবং থাকবো।
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনায় দেখা যায়, তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তিনি বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং তৎকালীন কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২০২২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি তিনি পঞ্চমবারের মতো দল থেকে বহিষ্কৃত হন। পরে নানা রাজনৈতিক ইস্যু ও টকশোতে সরব থাকা আখতারুজ্জামান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বছর ১৩ই ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। গ্রেপ্তারের পর এখন তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলছে।



