গাইবান্ধায় নদী ভাঙনের কবলে ২৫ বছরে আড়াই হাজার পরিবার

, বাংলাদেশ

গাইবান্ধায় নদী ভাঙনের কবলে ২৫ বছরে আড়াই হাজার পরিবার

গাইবান্ধার সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার বাসিন্দারা তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর ক্রমাগত ভাঙনে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে অসহায় জীবনযাপন করছেন। এ সময়কালে অন্তত আড়াই হাজার পরিবার প্রায় ২০ বার নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। অনেকেই বাপ-দাদার ভিটা হারিয়ে বিভিন্ন শহরে গিয়ে শ্রমিক কিংবা দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। যারা এখনো টিকে আছেন, তাদের প্রতি বর্ষাতেই ভাঙনের মুখে পড়ার আতঙ্ক তাড়া করে ফেরে। এই দুই উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে প্রতি বছরই কৃষিজমি, বসতভিটা ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব পরিবারগুলো এখন বিভিন্ন শহরে গিয়ে শ্রমিক-দিনমজুর কিংবা নানা পেশা অবলম্বন করে জীবনযাপন করছে। আর যারা বাপদাদার মাটি আঁকড়ে পড়ে আছেন, তারা এখনো প্রতিবারই ভাঙনের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়সারা কাজ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তদারকির অভাবে উপজেলার যমুনা তীরবর্তী মুন্সিরহাট এলাকায় এ প্রকল্পটি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত যমুনার গতিপথ পরিবর্তন ও তীব্র ভাঙনের ফলে সাঘাটা উপজেলার প্রায় ২০.৮৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে উপজেলার হলদিয়া, জুমারবাড়ি ও সাঘাটা ইউনিয়নের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা গত ১০ বছরে নদী বিলীন করে নিয়েছে। এ পর্যন্ত অন্তত ১০টি মসজিদ, পাঁচটি মাদরাসা ও নয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রায় ১৭ বার ভাঙনের ভয়ে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে হয়েছে। সাঘাটা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিশ শাফী জানান, ভাঙনের কবলে পড়া বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাঘাটা উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত হলদিয়া, জুমারবাড়ী ও সাঘাটা ইউনিয়নে গত ১০ বছরে ৬০ ভাগ যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ১০টি মসজিদ, পাঁচটি মাদরাসা ও ৯ প্রাথমিক বিদ্যালয় অন্তত ১৭ বার যমুনার করাল গ্রাস থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এই ভাঙন রোধে আগের সরকারের আমলে ১০১ কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনা নদীর তীররক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে সাঘাটার মুন্সিরহাট এলাকায় চারটি প্যাকেজে কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে প্যাকেজ-১ এর জন্য ২৫ কোটি ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় ৩১১.৫১ মিটার, প্যাকেজ-২ এর জন্য ২৬ কোটি ৪২ লাখ ৪৪ হাজার টাকায় ৩২৭ মিটার, প্যাকেজ-৩ এর জন্য ২৪ কোটি ৩৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকায় ২৯৭ মিটার এবং প্যাকেজ-৪ এর জন্য ২৪ কোটি ৯৯ লাখ ৫২ হাজার টাকায় ২৯৫ মিটার নদীতীর সংরক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ভাঙনরোধে স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে ১০১ কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনা নদীর তীররক্ষা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় বিগত সরকারের সময়। এ ভাঙনের শিকার মানুষদের রক্ষায় নদীশাসন প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

তবে প্রকল্পের কাজ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের জিও ব্যাগ, দুর্বল সিসি ব্লক, পুরাতন ছেঁড়া জিও ম্যাট এবং খোয়ার বদলে মাটি মিশ্রিত রাবিশ ও নিম্নমানের বালু ব্যবহার করছে। তিনবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ সম্পন্ন করা যায়নি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে কাজ চললে মুন্সিরহাট বাজার, উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বিস্তৃত আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প এলাকায় কাজ কিছুটা দেরিতে শুরু হলেও কাজের গতি বর্তমানে সন্তোষজনক। তিনি নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, সঠিক মান বজায় রেখেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।