মৌসুমি ফ্লু কি আসলেই সামান্য?

, জীবনযাপন

মৌসুমি ফ্লু কি আসলেই সামান্য?

সামান্য ফ্লু হয়েছিল, এমন কথা বলে অবহেলা করার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হলো এক বয়স্ক নারীর মৃত্যুর ঘটনা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল, পর্যাপ্ত তরল আর বিশ্রাম নিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ফ্লু থেকে নিউমোনিয়া, সেখান থেকে সেপসিস ও শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং সবশেষে আইসিইউতে ২৪ দিন লড়াই করে প্রাণ হারান তিনি। এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ফ্লুকে ‘সামান্য’ মনে করার দিন শেষ। মর্মান্তিক গল্পটা বলতে বলতে তাঁর সন্তান মন খারাপ করে জানতে চাইলেন, ফ্লু কি আসলেই ‘সামান্য’ বিষয়। নাকি এটি থেকে এমন বড় বিপদ যে কারও জীবনে নেমে আসতে পারে।

মৌসুম পরিবর্তনের এই সময়ে সর্দি, কাশি, হাঁচি, গলাব্যথা কিংবা মাথাব্যথার মতো উপসর্গ নিয়ে জ্বর আসা খুব সাধারণ বিষয়। বেশিরভাগ মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে এমনটা মনে করেন। সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিন বিশ্রাম ও সাধারণ চিকিৎসায় অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি কথা প্রচলিত আছে, চিকিৎসা করলে ফ্লু সারে সাত দিনে, না করলে এক সপ্তাহে। কিন্তু এই রোগকে পুরোপুরি অবহেলা করা ঠিক নয়। এই মৌসুমি ফ্লুর আক্রমণে রীতিমতো অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমরা।

পরিসংখ্যান বলছে, ফ্লু ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ থেকে সাড়ে ছয় লাখ রোগী প্রাণ হারান। এর পেছনে মূল কারণ হলো যখন ফ্লু ভাইরাস আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে, বিশেষ করে ফুসফুসকে অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়। এর ফলে শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নিউমোনিয়ার মতো জটিল সংক্রমণের পথ প্রশস্ত হয়। বাইরের ব্যাকটেরিয়া সহজেই ফুসফুসে আক্রমণ করতে পারে। প্রায় সব পরিবারেই এটা একটা পরিচিত অসুখ হয়ে উঠেছে। আর অনেকেই জানেন এর পেছনে যে ভাইরাসটি থাকে, তার নাম হচ্ছে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস।

সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা না পেলে রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে সেপসিসের মতো প্রাণসংহারী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সংক্রমণের প্রভাব কেবল ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি মস্তিষ্কে ছড়িয়ে এনকেফালাইটিস কিংবা হার্টে প্রদাহের মতো (মায়োকার্ডাইটিস) ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই হাঁপানি বা সিওপিডির মতো ফুসফুসের জটিলতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ফ্লু থেকে রেসপিরেটরি ফেইলিউর হয়ে আইসিইউ পর্যন্ত যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমনকি মস্তিষ্কেও ছড়াতে পারে সংক্রমণ, হতে পারে এনকেফালাইটিস, হার্টের প্রদাহ (মায়োকার্ডাইটিস) ইত্যাদি।

সব রোগীর ক্ষেত্রে এমন জটিলতা দেখা দেয় না, তবে শিশু, বৃদ্ধ এবং বিশেষ শারীরিক অবস্থার রোগীদের বাড়তি সতর্ক থাকা জরুরি। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ক্যানসার, হার্ট বা কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগ, অতি স্থূলতা কিংবা গর্ভাবস্থায় শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়, ফলে তাদের জটিলতায় পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়া কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবনের ফলেও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যেতে পারে, যা ফ্লুকে প্রাণঘাতী করে তুলতে পারে।

সাধারণ সর্দি-জ্বরে আতঙ্কিত হয়ে যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের ওপর কাজ করে না। তবে যদি জ্বর অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায়, দীর্ঘস্থায়ী হয়, শ্বাসকষ্ট বা প্রচণ্ড কাশি দেখা দেয়, দুর্বলতায় অজ্ঞান হওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়, কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়, তবে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। এছাড়া খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া বা অসংলগ্ন আচরণও বিপজ্জনক লক্ষণ।

ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ফ্লু আরও বেশি সতর্কতার দাবি রাখে, কারণ সংক্রমণের সময় রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে বা কমে যেতে পারে। তাই এ সময় ঘনঘন রক্তের শর্করা পরীক্ষা করা এবং পর্যাপ্ত তরল পান করা প্রয়োজন। নিজ থেকে কোনো ইনসুলিন বা ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

সুস্থ থাকার জন্য মৌসুম পরিবর্তনের সময় সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা ভিড় এড়িয়ে চলবেন, বাইরে মাস্ক ব্যবহার করবেন এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস করবেন। নিয়মিত হাত ধোয়া এবং হাঁচি-কাশির আদবকেতা মেনে চলা সংক্রমণ ছড়ানো রোধ করতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিস স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং সম্ভব হলে আলাদা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।

সবশেষে, ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে সুরক্ষা পেতে টিকার কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক জানান, প্রতিবছর শীতের আগ মুহূর্তে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের দিকে ফ্লুর টিকা নিলে জটিলতার ঝুঁকি থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকা সম্ভব। বিশেষ করে বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য এই টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।