দিল্লি জুড়ে কড়াকড়ি: ‘জ্ঞানেশ হটাও’ অভিযানে হাজারো আন্দোলনকারী আটক

, বিশ্ব

দিল্লি জুড়ে কড়াকড়ি: ‘জ্ঞানেশ হটাও’ অভিযানে হাজারো আন্দোলনকারী আটক

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি আজ শুক্রবার সকাল থেকেই কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা পড়েছে। আগামীকাল শনিবার ঘোষিত ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাওয়া আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে প্রশাসন বিশেষ তৎপরতা শুরু করেছে। মূলত মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে পদত্যাগের দাবিতে ‘জ্ঞানেশ হটাও’ অভিযানের অংশ হিসেবে এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)।

সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন যে, এই কর্মসূচিতে জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি অংশ নেবেন। ধ্রুব রাঠি নিজেই জানিয়েছেন, গণতন্ত্র বাঁচানোর এই লড়াইয়ে তিনি যোগ দেবেন এবং সবাইকে ১০ অক্টোবর দিল্লিতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। ধ্রুবর এই ঘোষণার পর থেকেই সবার মাঝে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, দিল্লি পুলিশ আদৌ তাদের রাজপথে নামতে দেবে কি না, নাকি তার আগেই গ্রেপ্তার করা হবে। আন্দোলনের শরিক হতে ভারতে এসে ধ্রুব নিজেও বলেছেন, ‘এটা গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই। ৮ তারিখ আমি বেঙ্গালুরুতে থাকছি, ১০ তারিখে কেউ দিল্লি আসতে ভুলবেন না।’। ধ্রুবর পাশে থাকা দক্ষিণের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রকাশ রাজ জানাতে ভোলেননি, ‘আলি রে আলি, জ্ঞানু, সময় শেষ; এবার তোমার যাওয়ার পালা।

সংশয় যে অমূলক নয়, তা বোঝা যাচ্ছে প্রশাসনের ব্যাপক ধরপাকড়ে। সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কার অভিযোগ, ইতিমধ্যে বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকে প্রায় ১০ হাজার সিজেপি কর্মী ও সমর্থককে আটক করা হয়েছে। পুনে থেকে একদল ছাত্রকে বাসে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, আটককৃতদের কোথায় রাখা হয়েছে তার কোনো হদিস মিলছে না। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণ শিক্ষার্থীদের ভ্যানে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কিন্তু পুলিশ এর কোনো কারণ ব্যাখ্যা করছে না। গতকাল বৃহস্পতিবার এক্সে তিনি লিখেছেন, আটক করা হয়েছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক দল ও সিজেপি সমর্থকদের। রয়টার্স লিখেছে, নানা জায়গা থেকে তরুণ ছাত্রছাত্রীদের আটক করে ভ্যানে করে কোথায় নেওয়া হচ্ছে, কেন তাঁদের আটক করা হচ্ছে, এ বিষয়ে পুলিশ কিছুই জানাচ্ছে না। রাজ্যে রাজ্যে পুলিশ ও প্রশাসনের এ তৎপরতার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত, জেন–জির প্রস্তাবিত আন্দোলনে কেন্দ্রীয় সরকার ভীত।

ভীত না হয়ে সিজেপির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, তারা যন্তর মন্তর অভিযান পরিচালনা করবেনই। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশ্যে বলেছেন, জেলে ঢোকানো বা গুলি চালানো হলেও তারা পিছু হটবেন না। এছাড়া রাজস্থান পুলিশ সিজেপির মুখপাত্র দীপক বালিয়ান ও তার ভাইকে মারধর করে আটকে রেখেছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। সেই বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি আমাদের জেলে ঢোকান বা গুলি করুন, আমরা প্রস্তুত। আপনার মানসিক বিকারগ্রস্ত আচরণে আমরা পেছু হটব না।

শনিবারের এই আন্দোলন মোকাবিলায় দিল্লি পুলিশ নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে। দিল্লি পুলিশের ২০ হাজার কর্মীর পাশাপাশি ২৩ হাজার আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং পাঁচ কোম্পানি সশস্ত্র নারী পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে সিআরপিএফ জওয়ানদের আনা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের আটকে রাখার জন্য বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়াম ও ছত্রসাল স্টেডিয়ামসহ মোট ১০টি স্টেডিয়াম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। শনিবার ভোর ৪টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত নয়াদিল্লি, পুরোনো দিল্লি ও নিজামউদ্দিন স্টেশন থেকে কোনো ট্রেন ছাড়বে না বা সেখানে পৌঁছাবে না। ফলে প্রায় ১০ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। এছাড়া বৃহস্পতিবারের বিধিনিষেধের কারণে ইতিমধ্যে পাঁচ হাজার যাত্রী যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। সীমান্ত এলাকাগুলোতেও পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ছাড়াও শুক্রবার রাত ৯টার পর থেকে আগামীকাল পর্যন্ত মোট ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। লুটেন্স দিল্লিতে বাইরের মানুষের প্রবেশ ঠেকাতে অ্যাপ-চালিত ট্যাক্সির ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া পাহাড়গঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার হোটেল মালিকদের নতুন কোনো বুকিং না নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি মসজিদের ইমামদের মাধ্যমেও মানুষকে ঘরে থাকার বার্তা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবারদের প্রভাবের কারণে সরকার চিন্তিত। দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যে সব ‘সিটিজেন জার্নালিস্ট’ মাঠে থাকবেন, তাদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করতে হবে এবং লাইভ স্ট্রিমিংয়ের নামে কোনো বিশৃঙ্খলা করা যাবে না। শনিবার যন্তর মন্তরের দিকে কোনো অবাঞ্ছিত ব্যক্তিকে যেতে দেওয়া হবে না বলে পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। একই দাবিতে রাজঘাটে কংগ্রেসের কর্মসূচি পালিত হয়েছে এবং সিজেপির সমাবেশে রাহুল গান্ধীসহ অন্যান্যদের উপস্থিতির খবরও পাওয়া গেছে।