দেশের বর্তমান বাস্তবতায় ‘ভাই’ শব্দটি যেন এক ত্রাসের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের পেশা বা আয়ের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে এখন অনেকেই নির্দ্বিধায় উত্তর দেন, তিনি অমুক ‘ভাই’য়ের সঙ্গে আছেন। এই ‘ভাই’ স্থানীয় পর্যায়ে মাস্তান কিংবা প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত, যার মূল কাজ ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা তোলা। ব্যবসায়ীরা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবাই এই চাঁদাবাজ চক্রের কাছে জিম্মি। শিল্পপতিরা মাস শেষে নিয়মিত চাঁদা পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যথায় হামলা ও নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাদের। এমন পরিস্থিতির কারণে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন বা নতুন বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না।
চাঁদাবাজির এই নেটওয়ার্ক এখন এতটাই বিস্তৃত যে, সরকারি বিভিন্ন খাত এমনকি ব্যাংক ঋণের প্রক্রিয়াও এদের নিয়ন্ত্রণে। ব্যাংক ম্যানেজারদের শাসিয়ে রাখা থেকে শুরু করে ফুটপাথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—কারও রেহাই নেই। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে যান চলাচল, বালুমহাল ইজারা এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ—প্রতিটি ক্ষেত্রে এই প্রভাবশালী গোষ্ঠী সক্রিয়। কিশোর গ্যাং ও বিভিন্ন বাহিনীর মাধ্যমে তারা আধিপত্য বজায় রাখে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন এই চাঁদাবাজির অস্থিরতায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক সময় নিম্নমানের মালামাল কিনতে বাধ্য করার মতো নজিরও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক মদতই এই অপরাধ কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে চান, তবে তাকে বদলি বা ওএসডির মতো শাস্তির মুখে পড়তে হয়। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনারা সবসময় আমাদের দোষারোপ করেন, বলেন আমরা দেখেও দেখি না। কিন্তু পোস্টিং ও প্রমোশনের ক্ষেত্রে যে বড় অংকের বিনিয়োগ করতে হয়, তা তো আপনাদের অজানা নয়। দায়িত্বরত অবস্থায় সেই বিনিয়োগ তুলে আনতে অনেক সময় অফিসারদের বাধ্য হয়েই এই চক্রের সাথে আপস করতে হয়।’
ইদানীং মব সন্ত্রাস ও দখলবাজির প্রবণতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা জাতিকে হতবাক করেছে। এছাড়া আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধেও এখন সরাসরি দখলবাজির অভিযোগ উঠছে, যার প্রেক্ষিতে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কবরস্থানের মাটি কেনা থেকে শুরু করে বিদেশগামী বাংলাদেশিদের ছাড়পত্র পাওয়ার মতো ব্যক্তিগত বিষয়েও এই ‘ভাই’দের নেটওয়ার্কের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে।
ছিনতাই ও রাহাজানি এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধের ধরণ বদলেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। আগে যেখানে বিদেশি ব্যাংকে টাকা জমানোর প্রবণতা ছিল, এখন সেখানে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই অর্থ লেনদেন করা হচ্ছে। প্রশাসন ও রাজনৈতিক কাঠামোর এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ফরম্যাটও পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে এই চাঁদাবাজদের নেটওয়ার্কও নতুন রূপ ধারণ করে, যার ফলে সাধারণ মানুষ বরাবরের মতোই জিম্মি অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর মানুষের আস্থাহীনতা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে।



