রিয়াদ বিমানবন্দরে গত সপ্তাহের ধারাবাহিক প্রাণঘাতী হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। তবে হামলার কয়েক দিন আগ থেকেই আসন্ন এই সামরিক বিপদের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক করা বন্ধ করে দিয়েছিল সৌদি আরব। কেন এই জরুরি সতর্কবার্তা প্রচার করা হয়নি, সে বিষয়ে রিয়াদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা সৌদি আরব নিজেদের দেশে একটি স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ধারণা করা হচ্ছে, হামলার আগাম বার্তা দিলে সহিংসতার প্রকৃত চিত্র সামনে চলে আসত, যা সরকারের এই কৌশলী অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। গত সপ্তাহে বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এ বিষয়ে সৌদি সরকারের কাছেও তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য চাওয়া হলেও জবাব পাওয়া যায়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, এই নীরবতার ফলে সৌদি আরবের নিজস্ব সুরক্ষাব্যবস্থা এবং সাধারণ বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতিনির্ধারণী গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ আবাসিক ফেলো ও সৌদি শিক্ষাবিদ সুলতান আলামের জানান, সৌদি সরকার দ্বিমুখী নীতি বজায় রাখতে চাইছে। তারা একদিকে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে চায়, অন্যদিকে জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেদের দেশে শান্তি বজায় রাখার আস্থা ধরে রাখতে আগ্রহী। বিমানবন্দরে হামলার সময় সতর্কবার্তা না দেয়ায় সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা ঝুঁকির মুখে রয়েছে এবং দেশটির বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের সুরক্ষা দেয়ার সক্ষমতা কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সকে এ কথা বলেছেন ওই অঞ্চলে কর্মরত চারজন পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তা এবং কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা, উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ সংস্থা ‘সিভিল ডিফেন্স’ সাধারণত আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের দায়িত্বে থাকে। রয়টার্স এ বিষয়ে সৌদি সরকারের মিডিয়া অফিস ও সিভিল ডিফেন্সের কাছে ই-মেইল করে উত্তর চেয়েছিল, তবে কোনো সাড়া মেলেনি। আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের শঙ্কা, এই দীর্ঘ নীরবতা সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ সোমবার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ ২৯ সেপ্টেম্বরের পর প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সতর্কবার্তা জারি করে রিয়াদ ও দক্ষিণাঞ্চলের কিছু শহরের বাসিন্দাদের সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছে। তবে বিমানবন্দরের ওই হামলাগুলোর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই তারা সতর্কবার্তা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কারণ, সতর্কবার্তার অনুপস্থিতি দেশটির মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। সর্বশেষ জুলাইয়ের হামলাগুলোর সময়ও বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকতে এবং জানালা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা শুরুর পর থেকে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলেই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সময়ে প্রতিটি হামলার আগেই বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনও সাইরেন বাজিয়ে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছে। মে মাসে সৌদি আরবও মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করেছিল, যা গত সপ্তাহের হামলার আগে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। সিভিল ডিফেন্সের ‘এক্স’ অ্যাকাউন্টের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বর, যা ছিল মূলত নাজরান প্রদেশকেন্দ্রিক। অথচ একই সময়ে প্রতিকূল আবহাওয়া বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে সিভিল ডিফেন্স নিয়মিত সতর্কতা প্রচার অব্যাহত রেখেছে। সোমবারও আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্কবার্তা প্রদান করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে সামরিক হুমকির চেয়ে অন্য বিষয়গুলোতে তারা বেশি সক্রিয় ছিল। বাহরাইন ও কুয়েতও বারবার সাইরেন বাজিয়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ওই সতর্কবার্তায় দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।



