সন্ধিক্ষণে দক্ষিণ এশিয়া: গণ-প্রত্যাখ্যান ও রাজনৈতিক রূপান্তরের কোন পথে

, বাংলাদেশ

সন্ধিক্ষণে দক্ষিণ এশিয়া: গণ-প্রত্যাখ্যান ও রাজনৈতিক রূপান্তরের কোন পথে

দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বশেষ গণ–অভ্যুত্থান হয় গত বছর এ রকম সময়। নেপাল সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কষছে এখন। ঠিক সেই সময় ভারত ও পাকিস্তানে তুমুল রাজনৈতিক বিক্ষোভ শুরু হলো। দিল্লি ও ইসলামাবাদ উভয় জায়গায় অসন্তোষের দাবিতে কাছাকাছি ধরনের মিল রয়েছে। নির্বাচনী দুর্নীতি এই ক্ষোভের প্রধান জায়গা। পাকিস্তানের বেলায় ইমরান খানের মুক্তি প্রধান এক চাওয়া। ‘ক্যাপ্টেন খান’ ও তাঁর সহযোগীদের আটকিয়ে জেনারেল আসিম মুনির যে ছদ্ম সামরিক শাসন চালাচ্ছেন, তার বিরুদ্ধে পিটিআই–কর্মীদের ইন্তিফাদা চলছে। এ রকম প্রশ্নমালার সাক্ষ্য-প্রমাণনির্ভর উত্তর পাওয়া মুশকিল।

ভারতের রাজনৈতিক সংকট ও হিন্দুত্ববাদের পচন

ভারতে দীর্ঘকাল গেরুয়াকরণ চলছিল নির্বিঘ্নে। ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকারা তার পচনশীল চেহারা উন্মোচন করতে শুরু করা মাত্র সেখানে রাস্তায় সারি সারি পুলিশ নামিয়ে দেওয়া হলো। ভারতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কে যেসব পুরোনো মিথ ছিল, শাসকদের দুষ্কর্মে তার অনেকখানি বিলীন হয়েছে ইতিমধ্যে। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থাকালীন দুঃশাসনের পর পুলিশ প্রশাসনের এমন জংলি রূপ আর কেন্দ্রীয় ভারতে দেখা যায়নি। ১৯৭৫ সালের সেই জরুরি অধ্যায় পেরোতে গণতন্ত্রপন্থীদের প্রায় দুই বছর লেগেছিল। ইতিহাসের বড় কৌতুক হলো ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থাবিরোধী সংগ্রামে যাঁরা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ছিলেন, এখনকার নিপীড়কদের বড় অংশ তাঁরাই। তবে ছোট কিছু সফলতা ছাড়া শিগগির এর বড় ফল দেখা যাবে বলে মনে হয় না।

তবে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ ও নির্বাচনী প্রশাসনের গভীরে হিন্দুত্ববাদীরা যে জাল বিস্তার করেছে, সেখান থেকে এ দেশকে সুপথে আনা কতটা সম্ভব—এ নিয়ে সন্দেহ কাটছে না। চলমান এই আন্দোলনের দৃশ্যাবলি থেকে একটু দূরে তাকালে তীব্র ধনবৈষম্য এবং বেকারির ক্ষত প্রকট। ১৪-১৫ বছর আগে মোদির তথাকথিত ‘গুজরাট মডেল’ কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির যেসব গল্প শুনিয়েছিল, তার ভাঁওতা এখন স্পষ্ট। ২০২৬ সালে আদানি ফোর্বস–এর বিলিয়নিয়ার্স তালিকায় ৩১তম জায়গায় আছেন, কিন্তু তাঁদের দাবির ভেতর মেঠো মানুষদের অর্থনৈতিক স্বস্তির উপাদান নেই। কমবেশি আট দশক আগে বিদায় নেওয়া ঔপনিবেশিক প্রভুদের কৌশলেই টিকে আছেন স্থানীয় কুলীনরা। অথচ এক দশক আগে তাঁর অবস্থান ছিল একই তালিকায় চার শর নিচে। এখনো কংগ্রেসসহ বিরুদ্ধবাদীরা নিচুতলায় টানাপোড়েনে থাকা মানুষদের নাগরিক আন্দোলনে যুক্ত করতে পারছে না। নেহা বোরা ও অভিজিৎ দিপকেদের ভাবমূর্তি শহুরে চৌহদ্দি পেরিয়ে এখনো মেঠো আবেদন তৈরি করতে পারেনি।

তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ও লাঠিতন্ত্রের দেওয়াল

রাজপথে নামা তরুণেরা অবক্ষয়ের শিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি পুনর্গঠন করতে চান। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ সমাজের মধ্যে দেশের উদারনৈতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য উদ্ধারের আকুল তাগিদ দেখা যাচ্ছে। তরুণেরা জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে ভারতকে নবসাজে সাজানোর কথা বলছেন। শাসক শিবির গণতান্ত্রিক মুখোশ খুলে বেশ খোলামেলাভাবে লাঠিতন্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত করার পথে নেমেছে। যদিও বিগত জাতীয় নির্বাচনে বিজেপি সব জোটসঙ্গীসহ প্রদত্ত ভোটের অর্ধেকের কম পেয়েছিল, কিন্তু বিরোধীপক্ষ বহু আঞ্চলিক শিবিরে বিভক্ত। সেই ক্লান্তি সর্বগ্রাসী এক প্রত্যাখ্যান পর্বের জন্ম দিলেও সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠন পর্বের হদিস নেই আপাতত। যদিও আরএসএস-বিজেপির নৈতিক ভিত্তি এবং বিপুল ব্যয়ে গড়ে তোলা মোদি-অমিত জুটির সুশীল ইমেজ ইতিমধ্যে ভেঙে দিয়েছেন তরুণেরা। বিজেপির দেড় দশকে বড় ব্যবসায়ীদের ব্যাপক উত্থান ঘটলেও কম মজুরি-জীবনের বিশাল এক জনমণ্ডলীও তৈরি হয়েছে। বিজেপির ধর্মীয় কথামালার বাইরে সাধারণ জনগণকে কী রকম রাজনীতি আকর্ষণ করতে পারে, তা নিয়েও বিস্তর বিতর্ক চলছে তাঁদের মধে৵। নিশ্চিতভাবে ভারতে দীর্ঘ পথের এক গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা এটা। যে পুরো প্রজন্ম গড়ে উঠেছে গেরুয়া ভাবাদর্শের সুনামির মধে৵ তাঁদের এই প্রত্যাখ্যান পর্বের রাজনৈতিক মূল্য অসামান্য। নতুন জরুরি অবস্থার অবসান হতে নিশ্চিতভাবে বাড়তি সময় লাগবে।

পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা

পাকিস্তানের লড়াই মূলত ছদ্ম সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে। জেনারেলরা ২০২৪ সালে পিটিআইয়ের হাত থেকে নির্বাচনী ফল ছিনিয়ে ভুট্টো ও শরিফ পরিবারকে ক্ষমতা ভাগ করে দিয়েছিল; কিন্তু মানুষ ফুঁসছে ও ধুঁকছে। বেলুচিস্তান, আজাদ-কাশ্মীর ও পশতুন এলাকায়ও সেনা-জুলুমের বিরুদ্ধে নিয়মিত সহিংস বিক্ষোভ হচ্ছে। পাকিস্তান ও ভারতের শাসকেরা জন–অসন্তোষ দমনে যা যা করছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশেও তা–ই করা হয়েছিল। উভয় দেশে বিরুদ্ধবাদীদের বিপক্ষে প্রকাশ্য ও গোপনে বিভিন্ন এজেন্সিকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের চেয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিসরের প্রধান দুর্বলতা হলো এখানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সাংগঠনিক রাজনীতিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি অতীতে।

  • ইমরান খান কি ভুট্টোর ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছেন—এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র। তবে সেনাবাহিনী তাকে ‘শহীদ’ করার ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
  • শ্রীলঙ্কায় জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) সরকার গঠন করলেও রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে পারেনি।
  • নেপালে বালেন্দ্র শাহর টিম নিয়ে মানুষ এখনো অপেক্ষা করতে ইচ্ছুক, কারণ পুরোনো রাজনীতিবিদদের কৃতকর্মের হিসাব নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
  • বাংলাদেশের লাল চব্বিশের সঙ্গে পাকিস্তানের আন্দোলনের বড় ফারাক হলো পিটিআই কর্মীদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি নেওয়ার মতো আবেগ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি।
  • পাকিস্তান ও ভারতের জনসমাজ আজ এমন নেতৃত্ব খুঁজছে, যারা সৎ, বিদ্যুৎ বিল কমাবে, জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং শ্রমের বাজার ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

দক্ষিণ এশিয়ার চলমান রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে গণতন্ত্রের বৈশ্বিক ইতিহাসের নতুন এক নিরীক্ষা হিসেবেও দেখা যায়। এর ‘ক্রোধে পোড়া অংশ’ কেবল এখন সামনে আছে। এতে জ্বালানি জোগাচ্ছে ক্ষমতাহীনতার স্থায়ী এক সামাজিক বোধ। ভারত-পাকিস্তানের চলতি রাজনৈতিক আন্দোলনের বেশ পদ্ধতিগত মিলও দেখা যাচ্ছে ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কা, ২০২৪ সালের বাংলাদেশ এবং ২০২৫ সালের নেপালের সঙ্গে। এই অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জঞ্জাল থেকে মুক্তি চায়, কিন্তু প্রশাসনিক প্রভুতন্ত্র এবং অভিজাত শ্রেণির আগ্রাসন সেই পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় দেশে এলিটদের নিয়ে সামাজিক হতাশা ও বিরক্তির আরও অনেক গভীর ও বহুমাত্রিক কারণও আছে। কেবল নির্বাচনব্যবস্থা এবং আর্থিক দুর্নীতিই কি সমাজদেহ থেকে উথলে ওঠা কূলভাঙা এই প্রত্যাখ্যানের কারণ। প্রকাশ্যে যা দেখা যাচ্ছে—কোথাও ধর্ম, কোথাও সমরবাদী লাঠিতন্ত্র পরিবর্তনের উদ্যোগ এবং আকাঙ্ক্ষাকে আটকে দিচ্ছে। কোথাও উগ্র জাতীয়তাবাদ, কোথাও ধর্মের আবরণে জেঁকে বসা প্রভু-ভৃত্য সম্পর্কে মানুষ ক্লান্ত। নির্দলীয় ও অহিংস এই প্রতিবাদ বিরোধী দলগুলোকে কাছাকাছি আসা এবং পথে নামার সুযোগ করে দিয়েছে। বেড়েছে কেবল গৌতম আদানির মতো গুটিকয়েক ক্রনি-ক্যাপিটালিস্টের ব্যাংক ব্যালেন্স। স্থানীয়ভাবে জনসমাজকে ধর্মের বয়ানে মশগুল রাখায় টিম-মোদি সফল ছিল মূলত কার্যকর বিকল্প রাজনীতির দুর্বলতায়। এবার প্রতিপক্ষ সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে অনেক শক্তিশালী ও নির্মম।