যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। রিপাবলিকান পার্টির জন্য সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন ট্রাম্প। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালেই মিলারকে তার অন্যতম বিশ্বস্ত উপদেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। ৪১ বছর বয়সি মিলার ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে নীতি নির্ধারণে পর্দার আড়ালে বড় প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত জয়ের পর প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ও বক্তব্য লেখক হিসেবে দায়িত্ব পান মিলার। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প যখন আবার রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করেন, তখনো তার পাশে ছিলেন মিলার। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিদিন এ সংখ্যা আরো বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলেও জানান তিনি।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু ও উত্থান
ট্রাম্পের সাথে পরিচয় হওয়ার অনেক আগে থেকেই রক্ষণশীল রাজনীতিতে মিলারের সম্পৃক্ততা ছিল।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকা হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি স্থানীয় বিভিন্ন বেতার অনুষ্ঠানে উদারপন্থী ধারার কঠোর সমালোচনা করতেন। পরে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ডিউক কনজারভেটিভ ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেন।
পরবর্তীতে ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ২০১৬ সালের শুরুর দিকে তিনি ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারাভিযানে যোগ দেন, যেখানে তিনি ট্রাম্পের বাচনভঙ্গি ও বার্তা তৈরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। স্টিভ ব্যাননের মতে, ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর খুঁজে পেতে মিলারের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগের সময় তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সে সময় তিনি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন বলেছিলেন, শুরু থেকেই ট্রাম্প ও মিলারের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া ছিল। হোয়াইট হাউসে মিলারের ভূমিকা নিয়ে তারা তদন্ত শুরু করতে পারে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। পড়াশোনা শেষে ওয়াশিংটন ডিসিতে চলে যান মিলার। এ অবস্থান তৈরিতে মিলারের ভূমিকা নিয়েও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রশ্ন উঠেছে। গত জুলাইয়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক স্নাতক শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিল ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন।
অভিবাসনবিরোধী কর্মকাণ্ড ও বিতর্কিত নীতিমালা
মিলারকে ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতির প্রধান কারিগর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৮ সালে বিচার বিভাগের গৃহীত বিতর্কিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন তিনি। এর ফলে সীমান্তে অভিবাসী পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। পাশাপাশি, ড্যাকা (DACA) কর্মসূচি বাতিলের প্রচেষ্টা এবং বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের পেছনেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা প্রায়ই তার বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী আদর্শকে উৎসাহিত করার অভিযোগ তোলেন। ২০১৯ সালে সাউদার্ন পভার্টি ল সেন্টার তার ই-মেইল ফাঁস করলে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়। ২০২০ সালে হোয়াকিন কাস্ত্রোসহ একাধিক কংগ্রেস সদস্য প্রকাশ্যে তার হোয়াইট হাউসে উপস্থিতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংগঠন সাউদার্ন পভার্টি ল সেন্টার কিছু ই-মেইল প্রকাশ করে। এ সময় অভিবাসনকে পশ্চিমা ‘সভ্যতা’ রক্ষার বিষয় হিসেবে তুলে ধরতেন তিনি। ২০২০ সালে কংগ্রেস সদস্য হোয়াকিন কাস্ত্রো এক বিবৃতিতে বলেন, একজন পরিচিত শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী মতাদর্শের সমর্থককে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিনির্ধারণে ক্ষমতাশালী পদে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি ‘মুসলিম ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা’ নামে পরিচিতি পায়। সংশোধিত সংস্করণটি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সমর্থন পায়। ট্রাম্পের বহিষ্কার অভিযানের অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থন এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা ভিসাধারী ও স্থায়ী বাসিন্দাদেরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রভাব
২০২৫ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসার পর মিলার আরও জোরালো ভূমিকা পালন করছেন। দেশজুড়ে ব্যাপক হারে অভিবাসীদের বহিষ্কারের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তার নেতৃত্বে রয়েছেন তিনি। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার (আইসিই) মাধ্যমে প্রতিদিন অন্তত তিন হাজার মানুষকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে সামরিক শক্তির ব্যবহার করে গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো বিতর্কিত মন্তব্য করেও তিনি আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের চেয়ে ক্ষমতার কঠোর প্রয়োগই বিশ্ব রাজনীতি পরিচালনার মূল ভিত্তি। সোমবার থেকে সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ওই নীতিতে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী প্রায় প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ককে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে এ কর্মসূচিতে নতুন আবেদন গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। অপরাধমূলক আটককেন্দ্রে শিশুদের মা-বাবার সঙ্গে রাখার সুযোগ না থাকায় তাদের আলাদা করে ফেলা হয়। শিশু বয়সে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য বৈধ কাগজপত্র পাওয়ার সুযোগ দেওয়া কর্মসূচি ডাকা (ডিফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস) বন্ধের পক্ষেও প্রচার চালিয়েছিলেন মিলার। প্রাথমিক আদেশে সিরিয়া, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকদের ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় ফেরার পর তাকে নীতিবিষয়ক উপপ্রধান এবং জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়। মিনিয়াপোলিসে জানুয়ারিতে পরিচালিত এক অভিযানে রেনে গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হওয়ার পর প্রথমে তিনি দুজনকেই ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করেন।
আইনি চ্যালেঞ্জ ও অভিযোগ
মিলার কেবল অভিবাসন নীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, ট্রাম্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতি জোরালো সমর্থন দিয়ে গেছেন।
২০২৩ সালে তিনি প্রকাশ্যে রাশিদা তালিবকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছিলেন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করেন। এসব অভিযানে ক্রমেই এমন ব্যক্তিদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, যাদের কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই অথবা যাদের বিরুদ্ধে সামান্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
মাহমুদ খলিলের দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফিলিস্তিনিদের ওপর বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর পেছনে কর্মকর্তারা তৎপর ছিলেন এবং সেই প্রক্রিয়ায় মিলারের সম্পৃক্ততা ছিল।
এছাড়া, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার বাতিল করার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ডেমোক্র্যাটরা এখন আসন্ন জানুয়ারিতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর মিলারের এসব কর্মকাণ্ড ও তার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে তদন্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
- মিলার ২০১৭ সালে কয়েকটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন।
- ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয় মেনে না নিয়ে ট্রাম্পের ভিত্তিহীন অভিযোগের অন্যতম সমর্থক ছিলেন তিনি।
- মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন কর্মকর্তাদের আক্রমণাত্মক কৌশলের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন মিলার।
- ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়ে যারা সরব, এমন স্থায়ী বাসিন্দাদের ওপরও তিনি প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টির কৌশল গ্রহণ করেছিলেন।
- ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নির্ধারণে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহারের অভিযোগ তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বড় অংশজুড়ে রয়েছে।
- ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি প্রতিদিন তিন হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানিয়েছিলেন।
- তিনি বিশ্বাস করেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রথাগত শিষ্টাচারের চেয়ে সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ বেশি জরুরি।
- তার কর্মপদ্ধতি ও নীতি নির্ধারণের ধরণ নিয়ে হোয়াইট হাউসে বড় ধরণের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
- সিনেটর জেফ সেশন্সের সহকারী হিসেবে কাজের সময় থেকেই তিনি অভিবাসন বিষয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন।
- ট্রাম্পের বক্তব্যের ধরণ পরিবর্তনে মিলার ছিলেন অন্যতম প্রধান কৌশলবিদ।
- আইসিই বা ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে তিনি সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন।
- হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে মিলারের এই নতুন পদমর্যাদা আগামী দুই বছরের মার্কিন রাজনীতিকে আরও মেরুকৃত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।



