গ্রামের ধুলোমাখা মাঠ থেকে ভবিষ্যতের ক্রীড়াবিদ খুঁজে বের করতে বড় ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর পর্যন্ত বিস্তৃত এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো হারিয়ে যাওয়া খেলার মাঠ ফিরিয়ে আনা এবং তৃণমূল থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করা। বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৭৮টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে, যার প্রতিটিতে অন্তত ৮ বিঘা জমির ওপর আধুনিক উন্মুক্ত খেলার মাঠ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যেসব এলাকায় ৮ বিঘা জমি পাওয়া সম্ভব নয়, সেখানে অন্তত ৪ বিঘা জমিতে মাঠ নির্মাণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি ইতোমধ্যে মাঠ চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু করেছে এবং জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল পর্যায়ে মাঠের সংকটের কারণে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় সরকার একই সঙ্গে দেশের ১০টি জেলায় আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া কমপ্লেক্স বা স্পোর্টস ভিলেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রায় ৭ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত প্রতিটি কমপ্লেক্সে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম, ইনডোর এরিনা, সাঁতার, শুটিং, আর্চারি, জিমনেশিয়াম এবং বিভিন্ন আউটডোর খেলার আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। এর মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায়েই বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপজেলা পর্যায়েও ক্রীড়া অবকাঠামোর উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১২৫টি উপজেলায় নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং দ্বিতীয় ধাপে আরও ২০১টি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে। তৃতীয় ধাপে বাকি উপজেলাগুলোকেও এই প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব স্টেডিয়াম কেবল আনুষ্ঠানিকতার জায়গা নয়, বরং স্থানীয় ক্রীড়াবিদদের নিয়মিত অনুশীলন ও প্রতিভা বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
দেশের প্রতিটি জেলা ও বিভাগীয় শহরে বিদ্যমান স্টেডিয়ামের পাশাপাশি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে এই নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি ধারাবাহিক ক্রীড়া উন্নয়ন কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে। এই কাঠামোর অংশ হিসেবে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ নামক উদ্যোগের মাধ্যমে সারা দেশ থেকে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সি প্রতিভাবান কিশোর-কিশোরীদের খুঁজে এনে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। সঠিক পরিকল্পনা, কোচিং, পুষ্টি ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন যুগের সূচনা হবে।
একসময় গ্রামের মাঠ থেকেই উঠে আসতেন অসংখ্য তারকা খেলোয়াড়। সময়ের বিবর্তনে মাঠের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে শিশুদের খেলাধুলার জায়গা সংকুচিত হয়েছে। এখন সরকার সেই হারানো মাঠ ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছে। প্রতিটি ইউনিয়নের চার বা আট বিঘার মাঠগুলো ভবিষ্যতে অলিম্পিয়ান, এশিয়ান গেমস পদকজয়ী কিংবা বিশ্বমঞ্চে দেশের নাম উজ্জ্বলকারী নতুন নায়কদের সূতিকাগার হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই চার স্তরের অবকাঠামো—ইউনিয়নের মাঠ, উপজেলা মিনি স্টেডিয়াম, জেলা স্টেডিয়াম এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া কমপ্লেক্স কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে তৃণমূলের মেধাবী খেলোয়াড়রা জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার সুযোগ পাবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের যে কিশোর বা কিশোরীর প্রতিভা এতদিন সুযোগের অভাবে বিকশিত হতে পারেনি, তাদের সামনে এখন এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হবে।
পরিশেষে, এই মাঠগুলো কেবল ইট-পাথর বা ঘাসের সীমানা নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যতের স্বপ্নের ঠিকানা। বিকালের নরম আলোয় খালি পায়ে ছুটতে থাকা কোনো শিশুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের কোনো জাতীয় দলের খেলোয়াড়। সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা দেশের ক্রীড়া মানচিত্রকে পুরোপুরি বদলে দেবে।



