মেয়াদের অর্ধেক সময় পার হওয়ার আগেই সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোবাশ্বের মোনেম পদত্যাগ করেছেন। গতকাল দুপুরে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তার পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে তাকে ৫ বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তার এই আকস্মিক পদত্যাগ পিএসসির ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি পিএসসিতে বহুমুখী সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিল। তবে পিএসসি সূত্র জানিয়েছে, তার এই সংস্কারমূলক কার্যক্রমের কারণে সুবিধাবাদী একটি মহল শুরু থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আসছিল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগে প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও তার সময়ে এমন অভিযোগ মেলেনি।
পিএসসির দায়িত্ব নেয়ার পর ড. মোবাশ্বের মোনেম ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। তার লক্ষ্য ছিল বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত নিয়োগ সুপারিশ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ১২ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা। ৫০তম বিসিএস থেকে এই সময়সীমাভিত্তিক পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়েছে এবং ৫১তম বিসিএস থেকে নিয়মিতভাবে একটি বিসিএসের কার্যক্রম শেষ করে পরবর্তী বিসিএস শুরু করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বর্তমানে চলমান বিসিএসগুলোর জট কমাতে একযোগে ৪৪তম, ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৮তম ও ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এসব বিসিএসে ৭ হাজার ৬৫১ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। এছাড়া ৪৭তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে দ্রুত চূড়ান্ত ফল প্রকাশ এবং ৫০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা দ্রুত মূল্যায়নের উদ্যোগও নেয়া হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং চাকরিপ্রার্থীদের বছরের পর বছর ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। দায়িত্ব নেয়ার পর ৩/৪টি বিসিএস এবং নন-ক্যাডার পরীক্ষাসমূহের জট নিরসন করে পিএসসি’র কার্যক্রমকে তিনি স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে এনেছিলেন।
অল্পসময়ের মধ্যে একটি নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস স্থাপনসহ এই সংক্রান্ত পুরো কার্যক্রম ডিজিটালাইজ করা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বর্তমান চেয়ারম্যানের মেয়াদকালে কোনো প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেনি এবং নিয়োগ বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগও আসেনি। বিভিন্ন ডিজিটাইজেশন এবং অটোমেশন প্রক্রিয়া চালু করার কারণে পিএসসি’র নিজস্ব সক্ষমতাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এই সাফল্যের বিপরীতে পিএসসি’র একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিনি প্রধানত দু’টি কারণে সরে যাচ্ছেন। এর একটি হতে পারে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়ায় নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাকে সরিয়ে দেয়ার চাপ ছিল। এ ছাড়াও সম্প্রতি পিএসসি থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পুরো স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাবনা দিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল, যা নিয়ে মন্ত্রণালয় ও কমিশনের মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়। কোনো একটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পিএসসি চেয়ারম্যানের প্রতি রুষ্ট ছিলেন এমন আলোচনাও রয়েছে পিএসসিতে।
বলা হচ্ছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই সিন্ডিকেটের তৎপরতার কারণে কিছুদিন ধরে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে তার এক ধরনের বিরোধ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পিএসসি চেয়ারম্যানের এই পদত্যাগ ভুল বার্তা দিতে পারে এবং সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় সরকারের প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। পদত্যাগপত্রে ড. মোবাশ্বের মোনেম শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করলেও পিএসসি কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি এতদিন নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়েছেন এবং দায়িত্ব পালনে কোনো সমস্যা ছিল বলে মনে হয়নি। গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন পিএসসি’র চেয়ারম্যানসহ ১২ জন সদস্য পদত্যাগ করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর ড. মোবাশ্বের মোনেমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।
পিএসসি’র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুবিধাবাদী মহলের তৈরি প্রতিবন্ধকতার কারণেই মোবাশ্বের মোনেম সাম্প্রতিক সময়ে কাজ করতে পারছিলেন না। এ কারণে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি যে কার্যক্রম ও পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিলেন তার ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কমিশনের কর্মকর্তারা। বর্তমানে পিএসসি’র প্রশাসনিক চাপ ও একাধিক বিসিএসের জটিলতা কমিয়ে পরীক্ষার আয়োজন, খাতা মূল্যায়ন, মৌখিক পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে যে সময়বদ্ধতা ও ধারাবাহিকতা আনা হয়েছিল, তা বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে পিএসসি’র ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে বর্তমান কমিশন যে ডিজিটাল সক্ষমতা তৈরি করেছিল, তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



