কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ তার পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। নিহত অন্যরা হলেন দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমিন, তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম হোসেন। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টার দিকে হোটেলের চার তলায় অবস্থিত এসি বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি। বুধবার নিহতদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার মরদেহ দেশে আনার কথা রয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্ত্রী, পুত্র ও শ্বশুরের উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৩রা আগস্ট ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে যান দেবাশীষ। সেখানে নারায়ণা হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ১৮ই আগস্ট মঙ্গলবার তারা কলকাতায় ফেরেন। দেশে ফেরার কথা থাকলেও কেনাকাটার জন্য তারা আরও একদিন সেখানে অবস্থান করেন। মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে দেশে রেখে যাওয়া সাত বছর বয়সী মেয়ে মহিমার সঙ্গে ভিডিও কলে শেষ কথা বলেছিলেন দেবাশীষ। সে সময় বাবা তাকে নতুন জামা ও চকোলেট কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই চকোলেট ও খেলনার বদলে এখন মহিমার জীবনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহত দেবাশীষ দত্ত আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি, চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি এবং স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে তিনি এশিয়ান টেলিভিশন ও নাগরিক টিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। তার এই আকস্মিক মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বুধবার বিকেলে কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার বাসায় সহকর্মী ও পরিচিতজনরা ভিড় করেন।
দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত জানান, তার ছেলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তিনি নিজে হৃদরোগে আক্রান্ত এবং তার স্ত্রীও অসুস্থ। প্রতি মাসে তাদের ওষুধের পেছনেই ১০-১২ হাজার টাকা খরচ হয়। এখন পরিবারের ভরণপোষণ ও নাতনি মহিমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এই বৃদ্ধ দম্পতি। দেবাশীষের ভায়রা মিটু চিকিৎসার জন্য ব্যাঙ্গালুরুতে তাদের সঙ্গে গেলেও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে মঙ্গলবারই দেশে ফিরে আসেন, ফলে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
প্রায় নয় বছর আগে ভিন্ন ধর্মের আফসানাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন দেবাশীষ। তাদের সেই সুখের সংসারে দুই সন্তান মহিমা ও স্বর্ণশীষকে ঘিরেই ছিল সব স্বপ্ন। কিন্তু কলকাতার সেই অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তেই সবকিছু ছাই করে দিয়েছে। বর্তমানে মহিমা তার দাদা-দাদির কাছে রয়েছে, তবে বাবা-মা ও ভাইকে হারানোর শোক সে এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছে না।
কলকাতা পুলিশ জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেল থেকে ৬০ জনকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে নয়জন অচেতন অবস্থায় ছিলেন, যাদের হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ঘোষণা করা হয়। নিহতদের মধ্যে দুইজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, হোটেলের এয়ার কন্ডিশনার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং দ্রুত কালো ধোঁয়া পুরো হোটেলে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাতে ঘুমানোর আগে ভিডিওকলে দেশে রেখে যাওয়া কন্যা মহিমাকে দেখিয়েও ছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কুষ্টিয়া শহরের বাড়িতে দেয়ালে টাঙানো বাবা-মায়ের ছবির দিকে নির্বাক তাকিয়ে মহিমা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাশেই একমাত্র পুত্র সন্তান, পুত্রবধূ ও নাতির ছবি জড়িয়ে বিলাপ করছিলেন মা স্বপ্না দত্ত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আশপাশের আত্মীয়স্বজন এই বৃদ্ধ দম্পতিকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই থামাতে পারেনি এই বৃদ্ধা মায়ের আহাজারি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব বলে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মা স্বপ্না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বুধবার বিকালে কুষ্টিয়া শহরের আরওয়াপাড়ায় যেতেই দেখা গেল, একটি বাসার সামনে শত শত মানুষের ভিড়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাসার ভেতর থেকে ভেসে আসছে আহাজারির শব্দ।



