বিশ্বের জ্বালানি বাজারে ওপেকের নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে চীন

, বিশ্ব

বিশ্বের জ্বালানি বাজারে ওপেকের নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে চীন

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম নির্ধারণে এতদিন তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক ও তাদের মিত্রদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই সমীকরণ নাটকীয়ভাবে বদলে যাচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীন এখন কেবল বিপুল পরিমাণ তেল কিনছে না, বরং নিজেদের আমদানি কমিয়ে বা বাড়িয়ে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম হচ্ছে। এর ফলে তেলের বাজারে ওপেকের দীর্ঘদিনের একক কর্তৃত্বের সামনে বেইজিং নতুন এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। সেই সময় বিশ্লেষকদের আশঙ্কা ছিল, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে পরিস্থিতি সেই ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল চীনের তেল আমদানি কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে দেশটি তাদের অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনে, যা দৈনিক প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেলের সমান। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের কারণে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম আরও প্রায় ৩০ ডলার পর্যন্ত কম থাকতে পেরেছে।

চীনের এই সক্ষমতার পেছনে রয়েছে তাদের বিশাল মজুত ভাণ্ডার। ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় চীন সস্তায় বিপুল পরিমাণ তেল কিনে মজুত বাড়িয়েছিল। ফলে যখন বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দেয় এবং দাম বাড়তে থাকে, তখন চীন নতুন করে তেল না কিনে নিজেদের মজুত থেকে চাহিদা মেটায়। এতে বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে এবং দামের ওপর চাপ কমে, যা পরোক্ষভাবে অন্য দেশগুলোর জন্যও স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ওপেক সাধারণত তেল উৎপাদন বাড়িয়ে বা কমিয়ে বাজারে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কিন্তু চীনের পদ্ধতিটি ভিন্ন। তারা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে নয়, বরং তাদের বিশাল ক্রয়ক্ষমতা ও মজুত ব্যবহারের মাধ্যমে বাজারে প্রভাব ফেলে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক হওয়ায় চীনের চাহিদার সামান্য পরিবর্তনও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি সিদ্ধান্তে দ্রুত আমদানি কমানো বা বাড়ানোর ক্ষমতা বেইজিংকে এমন এক ভূ-রাজনৈতিক শক্তি দিয়েছে, যা আগে কেবল ওপেকের দেশগুলোর হাতেই ছিল।

চীনের তেলের ওপর নির্ভরতা কমার পেছনে দেশটির দ্রুত বিদ্যুতায়নও বড় ভূমিকা রাখছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উন্নত গণপরিবহন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় দেশটি তেলের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে। জ্বালানি সংকটের সময় যখন দাম বৃদ্ধি পায়, তখন চীনের অনেক নাগরিক ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে মেট্রো, সাইকেল ও বিদ্যুৎচালিত পরিবহনের দিকে ঝুঁকছে। এতে অর্থনীতি সচল রেখেও তেলের ব্যবহার কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ওপেক জোটের অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও সদস্যদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে, চীনকে কোনো আন্তর্জাতিক জোটের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত নীতি পরিবর্তন করতে পারে, যা তাদের বিশ্ববাজারে এক অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরবরাহ সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও তেলের দাম শুধু উৎপাদক দেশগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। দুর্বল চাহিদার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুত বৃদ্ধি এবং চীনের আমদানি কমানোর মতো বিষয়গুলো এখন দাম নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বের জ্বালানি বাজার এখন এক নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একসময় যেখানে প্রশ্ন ছিল—ওপেক কত তেল উৎপাদন করবে, এখন সেখানে আরেকটি প্রশ্ন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—চীন কত তেল কিনবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক তেলের দাম নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন দ্য ইকোনমিস্ট, রয়টার্স ও ইরানঅয়েলগ্যাসের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষক সংস্থাগুলো।

পরিমাণের হিসাবে এটি দৈনিক প্রায় ৫৫ লাখ ব্যারেল।

বিশ্লেষকদের ধারণা, চীনের এই সিদ্ধান্ত না থাকলে বিশ্ববাজারে ব্রেন্টের দাম আরও প্রায় ৩০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারত।

সাম্প্রতিক তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, চীনের তেল আমদানির ওঠানামা এখন পুরো এশিয়ার বাজারকে প্রভাবিত করছে।

কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো।

বিদ্যুৎচালিত গাড়িও বদলে দিচ্ছে হিসাব

বিশ্ব তেলবাজারে ওপেকের প্রভাব এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণেই বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, বিশ্ব তেলবাজারে নতুন এক শক্তির উত্থান ঘটেছে।