এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া একদল শিক্ষার্থীর জীবনের গল্প অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণার উৎস। অদম্য মেধাবীদের নিয়ে আয়োজিত বিশেষ প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে এমন চার শিক্ষার্থীর কথা তুলে ধরা হলো, যারা প্রতিকূলতাকে জয় করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছে। তবে সন্তানের এই সাফল্যে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফুটলেও, উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানোর দুশ্চিন্তা তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
যশোরের কেশবপুর উপজেলার ব্যাসডাঙ্গা গ্রামের হাজিরা আক্তার মিতু অভাবের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়েছে। বর্ষাকালে এলাকাটি দীর্ঘ সময় জলমগ্ন থাকায় তার পরিবার চরম সংকটে পড়ে। বাবা হোসেন আলী ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করেন এবং মা শরিফা বেগম বিলে মাছ ধরেন। হাজিরা নিজেও টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছে। প্রতিদিন চার কিলোমিটার হেঁটে বিদ্যালয়ে যাওয়া হাজিরা বিজ্ঞানে পড়ার কারণে দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টা পড়াশোনা করেছে। তার স্বপ্ন ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার, কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান পড়ার ব্যয়ভার বহন করা নিয়ে তার পরিবার দিশেহারা। মা শরিফা বেগম জানান, অনেক দিন না খেয়েও মেয়েকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে হয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুপ্রভাত বসু জানান, হাজিরা অত্যন্ত মেধাবী এবং তার একাগ্রতার কারণেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে।
নীলফামারীর ডোমার উপজেলার মুসফিকুর রহমানের স্বপ্ন সফটওয়্যার প্রকৌশলী হওয়া। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া এই শিক্ষার্থী খাটুরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে প্রতিদিন তিন কিলোমিটার হেঁটে যাতায়াত করত। তার বাবা মো. আবদুল কাদের হাটবাজারে গরু কেনাবেচার কাজ করেন এবং ছয় শতাংশ ভিটেবাড়িই তাদের একমাত্র সম্বল। মুসফিকুর জানায়, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তার মা মনিরা আক্তার জানান, ছেলে আরও পড়তে চায় কিন্তু বাবার সামর্থ্য নেই। প্রধান শিক্ষক মো. সহিদুল ইসলাম জানান, মুসফিকুরকে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং সহযোগিতা পেলে সে তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ছুট লক্ষ্মীপুর গ্রামের নাদিয়া আফরিন কোনো কোচিং বা প্রাইভেট শিক্ষক ছাড়াই এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার বাবা কেরামত আলী অন্যের জমিতে দিনমজুরি করেন। ১০ শতক জমি থাকলেও তা থেকে সংসার চালানো কঠিন। নাদিয়া ছোটবেলা থেকেই বইয়ের প্রতি অনুরাগী। তার বাবা জানান, ধারদেনা করেও তিনি মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। নাদিয়ার ইচ্ছা চিকিৎসক হওয়ার, কিন্তু কলেজে ভর্তি ও আনুষঙ্গিক খরচ জোগানো এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইকরচালী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোয়ারুল ইসলাম নাদিয়াকে অনুকরণীয় শিক্ষার্থী হিসেবে উল্লেখ করে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সহায়তার আহ্বান জানান।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ পৌরসভার মরিয়ম খাতুন পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট। তার বড় চার বোন পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি, কিন্তু মরিয়ম সেই ধারা বদলে দিতে চায়। রিকশাচালক বাবা মো. নুরুল আমিন ও মা মোছা. গোলাপজানের উৎসাহে সে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। রায়গঞ্জ উপজেলা সদর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পাওয়া মরিয়ম উচ্চমাধ্যমিকেও সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়। বাবা নুরুল আমিন জানান, যত কষ্টই হোক তিনি মেয়েকে পড়াতে চান, তবে কিছুটা আর্থিক সহযোগিতা পেলে তাদের জন্য সুবিধা হতো।
এই চার শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি। দারিদ্র্য তাদের স্বপ্নকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, কিন্তু এখন উচ্চশিক্ষার পথে আর্থিক অনিশ্চয়তা তাদের সামনে বড় বাধা। সমাজের বিত্তবান ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা পেলে এই মেধাবীরা তাদের লক্ষ্য পূরণে আরও এগিয়ে যেতে পারবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর চার পরিবারেই আনন্দ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে আছে দুশ্চিন্তাও। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অভাবের সংসারে এত দিন কষ্ট করে পড়াশোনা করানো গেলেও এখন কলেজের ভর্তি, বই, যাতায়াতসহ খরচ কীভাবে জোগানো হবে, তা জানেন না তাঁরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বছরের সাত-আট মাস পানিতে তলিয়ে থাকে যশোরের কেশবপুর উপজেলার ব্যাসডাঙ্গা গ্রামের মাঠঘাট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখন কাজ না থাকায় প্রতিটি পরিবারে অভাব নিত্যসঙ্গী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাড়ির পাশের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পড়িয়ে নিজেরও কিছু আয় করত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমরা নিজেরা না খেয়ে সন্তানদের খাইয়েছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিদ্যালয় থেকে তার পরীক্ষার ফি নেওয়া হয়নি, সহায়ক বইপত্রও দেওয়া হয়েছে।



