বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলিও অনুমোদন করা হয়েছে। তবে বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতনকাঠামো পরবর্তীতে নির্ধারণ করা হবে। নতুন এই বেতনকাঠামো গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে এই কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সরকারি আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ বেতনকাঠামো নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ এখন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনা জারি করবে।
নতুন কাঠামোতে আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল থাকছে। তবে বেতনের হারে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকার পরিবর্তে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বেতন বৈষম্য কমাতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে।
বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার ধাপে ধাপে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে জাতীয় মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কম থাকে। এই প্রক্রিয়াটি নিম্নোক্তভাবে সম্পন্ন হবে
- মূল বেতন ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে তিনটি ধাপে সমন্বয় করা হবে।
- বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বর্তমান অনুপাত ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে।
- সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৪০ শতাংশ, আগামী বছরের জানুয়ারিতে ৩০ শতাংশ এবং পরবর্তী জুলাই মাসে বাকি ৩০ শতাংশ প্রদান করা হবে। ভাতা সংক্রান্ত সুবিধাগুলো ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। অবসরভোগীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
পেনশনভোগীদের জন্য নতুন কাঠামোতে বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যদিও ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তবে আর্থিক চাপের কারণে তা ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে যারা পেনশন পাচ্ছেন, তাদের পেনশনের হার ৯ হাজার টাকা বা তার কম হলে ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকার বেশি হলে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
নতুন বেতনকাঠামোয় প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু করা হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতিটি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। এছাড়া ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে সব গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতা যুক্ত করা হয়েছে। এই নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক-অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি উপকৃত হবেন। সরকারের বছরে বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিশাল অংকের অর্থের জোগান দিতে রাজস্ব আদায় বাড়ানো জরুরি। সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান জানান, বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যে শ্লথগতি রয়েছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এছাড়া এনবিআরের সংস্কার কার্যক্রম থমকে থাকায় রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি বেশ জটিল। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে এটি বাস্তবায়ন হবে দুই বছরের মধ্যে তিন ধাপে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বৈঠক শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে তা জানায়। চাকরির আরও তথ্য: অনুমোদনের পটভূমি তুলে ধরে বলা হয়, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার সুপারিশ প্রণয়নের জন্য একটি সচিব কমিটি গঠন করে। চাকরির আরও তথ্য: প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিধান থাকবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া অসামরিক কর্মচারী অনেকের তথ্য সরকারের কাছে নেই। চাকরির আরও তথ্য: এত দিন শুধু পঞ্চম গ্রেড থেকে ওপরের ধাপের সবার জন্য মোবাইল ভাতা প্রযোজ্য ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাশাপাশি সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীও এর আওতায় আসবেন।



