লোহিত সাগরে নিরাপত্তা: মিসর ও সৌদি আরবের নতুন সমীকরণ

, বিশ্ব

লোহিত সাগরে নিরাপত্তা: মিসর ও সৌদি আরবের নতুন সমীকরণ

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দ্রুত তৎপরতা এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালীকে ঘিরে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও মিসরের মধ্যে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। এই দুই দেশের সম্পর্ক এখন কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মূল স্তম্ভ হিসেবে গড়ে উঠছে।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর কায়রোতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বৈঠক করেন। বৈঠকে আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও লোহিত সাগরে অবাধ নৌ চলাচলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। সিসি এ সময় সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় মিসরের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ইয়েমেন সংকট নিরসনে একটি সর্বাত্মক ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান।

ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী সম্প্রতি ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকা ও বাব আল-মানদেবের নিকটবর্তী অঞ্চলগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। এতে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো এবং সুয়েজ খালের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর সরাসরি হুমকি তৈরি হয়েছে। রিয়াদ এখন লোহিত সাগরের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মিসরের সাথে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করতে আগ্রহী।

লোহিত সাগরের এই অস্থিতিশীলতা মিসরের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। কারণ সুয়েজ খালে জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়া মানেই মিসরের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ সংকুচিত হওয়া। বিশ্লেষক আবদেল মোনেম সাঈদ ও আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, বাব আল-মানদেব থেকে সুয়েজ খাল পর্যন্ত পুরো অঞ্চলটিকে এখন একটি অবিচ্ছেদ্য নিরাপত্তা বলয় হিসেবে বিবেচনা করছে কায়রো।

মিসরের পার্লামেন্টের আরববিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সালাহ আবু হিমিলার মতে, সৌদি-মিসর সম্পর্ক এখন কেবল দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়; এটি ফিলিস্তিন, লিবিয়া, সুদান ও ইয়েমেনের মতো জটিল আঞ্চলিক ইস্যুগুলোতে একটি সমন্বিত আরব কাঠামোর ভিত্তি হতে পারে। সিসির কার্যালয় থেকেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে যে, দুই দেশের নিরাপত্তা এখন বৃহত্তর আরব নিরাপত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

যদিও প্রকাশ্যে কোনো নতুন সামরিক চুক্তির ঘোষণা আসেনি, তবে অগাস্টে গঠিত সৌদি নেতৃত্বাধীন লোহিত সাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোটে মিসরের অংশগ্রহণ আগে থেকেই রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সামুদ্রিক নজরদারির মাধ্যমে এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি বড় কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের ব্যাপারে মিসর যথেষ্ট সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে গামাল আবদেল নাসেরের সময় ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে মিসরীয় সেনাদের অংশগ্রহণ এবং সেখান থেকে পাওয়া তিক্ত অভিজ্ঞতার বিষয়টি কায়রোর নীতিনির্ধারকদের স্মৃতিতে এখনো অমলিন। তাই সামরিক সহায়তার চেয়ে কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সমন্বয়কেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে তারা।

সুদানের চলমান সংকট নিয়েও দুই দেশ সমমনা। সাম্প্রতিক বৈঠকে তারা সুদানের ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি হুমকিকে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সুদানের যুদ্ধে আমিরাতের বিরুদ্ধে র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফকে সহায়তা করার যে অভিযোগ রয়েছে, তা নিয়ে রিয়াদ ও কায়রো সতর্ক। যদিও আমিরাত এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, তবে মিসর আনুষ্ঠানিকভাবে সুদানের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ নিয়েছে।

কায়রোর জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। কারণ একদিকে যেমন সৌদি আরবের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা জরুরি, তেমনি আমিরাতের সাথেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে মিসরে আমিরাতের নিট বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ছিল, যা এই সম্পর্কের গুরুত্ব স্পষ্ট করে।

সৌদি আরব বর্তমানে একক পরাশক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং লোহিত সাগরে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ গ্রহণ তারই অংশ। মিসরের সাথে এই সমন্বয় সেই প্রক্রিয়ারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পরিশেষে, লোহিত সাগরের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মুখে সৌদি আরব ও মিসরের এই কৌশলগত মৈত্রী অদূর ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে ইয়েমেনের ক্ষেত্রে সামরিক সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক আলোচনার দিকেই কায়রোর ঝুঁকে থাকার নীতি পরিবর্তনের লক্ষণ এখনো ক্ষীণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সময়ে সৌদি আরব ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির তেল অবকাঠামোও হুতিদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ বাব আল-মানদেব প্রণালির দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলো লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালে প্রবেশ করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সময়ে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মানদেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়েই আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর পেছনে মিসরের অতীত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৯৬০-এর দশকে তৎকালীন মিসরীয় নেতা গামাল আবদেল নাসের উত্তর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সেই সামরিক অভিযানে মিসরের উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ঘটে এবং প্রত্যাশিত ফলও আসেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারা বাব আল-মানদেবের কাছের মায়ুন দ্বীপ ও ধুবাব এলাকাতেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।