অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

, স্বাস্থ

অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

সেপ্টেম্বর মাস পার করে অক্টোবর মাসে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এতে করে দেশজুড়ে যে হাসপাতালগুলোতে রোগী সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে চাপ আরও বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবও চলমান। জ্বর, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথাসহ ডেঙ্গুর বিভিন্ন উপসর্গের এই পুনরুত্থান ২০২৩ সালের মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের পর নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে হামের কারণে এ বছর এক হাজার ১০০ জনের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল এন্টোমোলজিস্ট কবিরুল বাশার বলেন, তাদের পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও খারাপ পরিস্থিতির দিকে যেতে পারে। তিনি মশা নিধনে স্থানীয়ভাবে লক্ষ্যভিত্তিক কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি প্রজননস্থল ধ্বংস করার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, বড় শহরের সীমানা ছাড়িয়ে ডেঙ্গু এখন সারাদেশে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল ফগিং বা কীটনাশক ছিটিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার ধরণে যে পরিবর্তন এসেছে, তা এডিস মশার মৌসুমি আচরণকেও বদলে দিচ্ছে। ফলে মশা দীর্ঘ সময় সক্রিয় থেকে বংশবিস্তার করছে। ২০২২ সাল পর্যন্ত ২২ বছরের তথ্য নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, আগের কয়েক মাসের তাপমাত্রা ও বৃষ্টির সঙ্গে ডেঙ্গুর বিস্তারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বৃষ্টি হওয়ার ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। অক্টোবরে বাড়তে পারে সংক্রমণ বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত ও পরিবর্তিত আবহাওয়ার কারণে অক্টোবরজুড়েও ডেঙ্গুর সংক্রমণ অব্যাহত থাকতে পারে। বড় শহরের বাইরে ছড়িয়েছে ডেঙ্গু ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার বিস্তার এখন বড় শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়ায় রোগটি দেশব্যাপী চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে বলে জানান কবিরুল বাশার। মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করাও জরুরি। তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরে হওয়া বৃষ্টিপাত অক্টোবরেও সংক্রমণ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনেও বাড়ছে অনিশ্চয়তা ডেঙ্গু সংক্রমণের ধরন বদলে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষকদের মতে, আবহাওয়ার পরিবর্তন মশার সংখ্যা এবং রোগ ছড়ানোর গতিপ্রকৃতি-দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯ হাজার ৬২০ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৪৫ জনের। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৪৮ জন, যেখানে জুলাইয়ে ছিল ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জন। বর্তমানে সারা দেশে ৫ হাজার ৪৮৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন। বুধবার পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, একদিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৪৮ জন এবং মারা গেছেন ছয়জন। ডেঙ্গুর সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা না থাকায় সাধারণত পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার এবং প্যারাসিটামলের পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। তবে জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়।

ডেঙ্গু জয় করে ফেরা ৩০ বছর বয়সী পুলিশ সার্জেন্ট শফিকুর ইসলাম বলেন, ভাগ্যবান হিসেবে একটি বেড পেলেও অনেক রোগীই তা পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। তার অনেক সহকর্মীও আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি জানান, জনসেবায় নিয়োজিত থাকলেও অনেক সময় নিজেদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেয়া সম্ভব হয় না। এদিকে অনেক বাসিন্দা অভিযোগ তুলেছেন যে, মশা নিধনের পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। ৩২ বছর বয়সী জাহিদ হাসান জানান, তার এলাকায় প্রচুর মশা থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রতিকার দেখা যাচ্ছে না। তার চার বছর বয়সী সন্তান ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর নিজেও জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান সতর্ক করে বলেন, একসঙ্গে একাধিক রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা সীমিত। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধে মশার প্রজনন কমানোই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে বাসাবাড়ি ও আশেপাশে জমে থাকা পানি অপসারণের মতো জনসচেতনতামূলক কাজেও গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও এসব গবেষণার ফলাফল সামঞ্জস্যপূর্ণ।