সেন্ট ডেনিসে গতকাল রাতে ফ্রান্সের জাতীয় স্টেডিয়ামে দর্শকদের মুখে যেন একটিই জয়গান—‘এবং ব্যালন ডি’অর জিতলেন মাইকেল ওলিসে।’ আগামী ২৬ অক্টোবর ঘোষণা করা হবে বিশ্বের সেরা ফুটবলারের নাম। সেই ৩০ জনের তালিকায় থাকা এই ফরাসি মিডফিল্ডার বর্তমানে যে ফর্মে রয়েছেন, তাতে তাঁকে বিশ্বের সেরা দাবি করাটা অযৌক্তিক মনে করছেন না ফুটবলপ্রেমীরা। নেশনস লিগে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে ফ্রান্স কোচ জিনেদিন জিদানকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ওলিসে কি তবে এখন বিশ্বের সেরা ফুটবলার? ফরাসি এই মিডফিল্ডার বর্ষসেরার পুরস্কারটি পান বা না পান, এ মুহূর্তে তাঁকে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় বললে সম্ভবত সেটা খুব একটা বাড়াবাড়ি হবে না।
জিদানের রহস্যময় হাসি ও প্রতিক্রিয়া
প্রশ্নের উত্তরে জিদান সরাসরি কোনো ঘোষণা দেননি, বরং মুখে হাসি ফুটিয়ে তিনি বলেন, ‘ওলিসে? আমার কিছু বলার নেই। সে মাঠে যা করে, একদমই আলাদা।’ জিদানের এই কূটনৈতিক অথচ ইতিবাচক মন্তব্য সমর্থকদের এই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে যে, ওলিসে এখন সেরাদের কাতারে শুধু নন, বরং সেরা হওয়ার যোগ্য দাবিদার। ফ্রান্স কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর ৪ ম্যাচে ৩ জয় ও এক ড্র পাওয়া জিদান মনে করেন, বেলজিয়ামের বিপক্ষে এই জয়টি তাঁর কোচিং ক্যারিয়ারের এক অন্যতম ‘মাস্টারক্লাস’ ছিল। হয়তো এখনই ঘোষণাটা দেওয়ার সময় আসেনি বলে।
ম্যাচজুড়ে বদলি খেলোয়াড়দের আধিপত্য
ম্যাচের ৭৬ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল ফ্রান্স। গোল আদায়ে মরিয়া জিদান ৬০ মিনিটের পর একে একে চার বদলি নামান—লুকাস দা কুনিয়া, দেজিরে দুয়ে, মাইকেল ওলিসে ও রায়ান শেরকি। এরপরই ঘটে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। ম্যাচের বাকি ১৪ মিনিটে ফ্রান্সের করা ৪ গোলের সবগুলোই এসেছে এই তিন বদলি খেলোয়াড় দেজিরে দুয়ে, রায়ান শেরকি ও মাইকেল ওলিসের পা থেকে। ৮১ মিনিটে শেরকিকে দিয়ে গোল করানোর পর বায়ার্ন মিউনিখ মিডফিল্ডার ওলিসে নিজে গোল করেন ৮৮ ও ৯০+১ মিনিটে। প্রথমবারের মতো ইতিহাসের পাতায় ফ্রান্স ম্যাচের শেষ আধা ঘণ্টায় পিছিয়ে থেকেও তিন গোলের ব্যবধানে জয় তুলে নিল। বদলি খেলোয়াড় দিয়ে এভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে তুলে নেওয়া দুর্দান্ত জয়ে অবশ্যই কোচ জিদানের বাহবা পেতে পারেন। তবে এই ঘুরে দাঁড়ানোয় ওলিসের পারফরম্যান্স দেখলে যেন বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে পড়ে। রোমাঞ্চকর এ ম্যাচে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়ে জিদানের মন্তব্যটা হলো একটু দার্শনিক–সুলভ, ‘এটাই ফুটবল।
ওলিসের বর্তমান ফর্ম ও রেকর্ড
ওলিসে শুধু এই ম্যাচের পারফরম্যান্সেই সীমাবদ্ধ নন। বায়ার্নের হয়ে চলতি মৌসুমে ৭ ম্যাচে ৮ গোল এবং ফ্রান্সের জার্সিতে এ বছর ১৭টি গোলে অবদান (৭ গোল, ১০ অ্যাসিস্ট) তাঁর পরিসংখ্যানকে ঈর্ষণীয় করে তুলেছে। একুশ শতকে ক্যালেন্ডার বর্ষে ফ্রান্সের হয়ে এমন দাপট কেবল থিয়েরি অঁরিই দেখাতে পেরেছিলেন, যিনি ২০০৩ সালে ১৯টি গোলে অবদান রেখেছিলেন। বায়ার্নের হয়ে এ মৌসুমে ৭ ম্যাচে ৮ গোলের অসাধারণ পারফরম্যান্স তো আছেই, ফ্রান্সের হয়েও এ বছর তাঁর খেলা স্রেফ চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে অনেকেরই। ২০০৩ সালে তাঁর অবদান ছিল ১৯ গোলে।
কোচ ও খেলোয়াড়দের ভাষ্য
মাঠে নামার আগে শেরকি ও ওলিসেকে জিদানের কিছু নির্দেশনা দিতে দেখা যায়। এটি নিয়ে জানতে চাইলে ওলিসে বলেন, ‘এটি দলগত প্রচেষ্টার ফল। জিদান নতুন ধারণা নিয়ে আসেন, আমরা সেগুলো অনুসরণ করছি।’ জিদানও ব্যক্তিগত কৃতিত্বের চেয়ে দলীয় পারফরম্যান্সকেই গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘আমরা জানতাম বদলি খেলোয়াড়েরা ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। তারা উঁচু মানের ফুটবলার এবং প্রত্যেকে নিজের ভূমিকা দারুণভাবে পালন করেছে।’
পয়েন্ট টেবিলের বর্তমান অবস্থা
- ফ্রান্স: ৪ ম্যাচে ১০ পয়েন্ট নিয়ে ‘এ১’ গ্রুপের শীর্ষে।
- ইতালি: ৪ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে।
- বেলজিয়াম: ৪ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে।
- তুরস্ক: ৪ ম্যাচে ০ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার তলানিতে।
এবারের আন্তর্জাতিক বিরতি শেষে আগামী মাসে ইতালি এবং তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ফ্রান্স তাদের নেশনস লিগের গ্রুপ পর্ব শেষ করবে। প্রতিটি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুটি দল কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে।



