খুলনা মহানগরীতে গত তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ৩৩ মাসে মহানগরীর আট থানায় মোট ৯৬টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে সংঘটিত প্রতিটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ২৯টি, ২০২৫ সালে ৩৭টি এবং চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৩০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরে সদর ও লবণচরা থানায় ছয়টি করে এবং অন্যান্য থানায় ১৮টি মামলা হয়েছে। একই সময় জেলার ৯ উপজেলায় হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩৫টি। রক্তাক্ত জনপদে বাড়ছে প্রাণহানির তালিকা।
সর্বশেষ রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে আক্তার ঢালী নামক এক ব্যক্তি দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। গত সোমবার মাগরিবের নামাজের পর একটি চায়ের দোকানে থাকাকালীন মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। স্থানীয়দের সহায়তায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত আক্তার ঢালী গত ১৫ আগস্ট সংঘটিত তার ছেলে জয় ঢালী হত্যা মামলার বাদী ছিলেন। ওই মামলায় তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়ার জেরে প্রতিহিংসাবশত শ্বশুরবাড়ির লোকজন জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। এর আগে গত ১৫ আগস্ট আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।
পারিবারিক ও স্থানীয় বিরোধ মেটাতে বর্তমানে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ ব্যবহারের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পুলিশি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আধিপত্য বিস্তার, মাদক নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মতো অপরাধে সক্রিয় গ্রুপগুলো এখন প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। রূপসার এই বাবা-ছেলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এই ঘটনার তদন্ত চলছে।
মহানগরীর অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকাভুক্ত বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে বি-কোম্পানি, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, বেজি আল-আমিন, শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপ উল্লেখযোগ্য। অপরাধী গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের পর বিভিন্ন সময়ে এসব গ্রুপের তৎপরতার চিত্র গোয়েন্দাদের কাছে উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও কিলিং মিশনে পেশাদার সন্ত্রাসী গ্রুপের অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে ডিবি পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, অপরাধী যেই হোক, কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি দাবি করেন, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনেই মাদককেন্দ্রিক বিরোধের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
কেএমপির সহকারী কমিশনার (অপরাধ) গোলাম মোহাম্মদ জানিয়েছেন, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং অপরাধীদের দমনে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।



