বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ‘মব’ বা জনতার হঠাৎ করে সংগঠিত হয়ে ওঠার বিষয়টি এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো এটি প্রতিবাদের বৈধ হাতিয়ার মনে হলেও, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি অন্ধ প্রতিশোধপরায়ণতা ও অরাজকতার রূপ নেয়। জনতার এই আচরণ মূলত সমাজের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ভয়, ক্ষোভ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। ঐতিহাসিকভাবে জনতার ঐক্য ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে কাজ করলেও, বর্তমানে এই শক্তি প্রায়শই নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জনতার ঐক্য ছিল মুক্তির শক্তি। গ্রামীণ কৃষক থেকে শহুরে শ্রমিক—সবাই একত্র হয়েছিল স্বাধীনতার জন্য।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদ গুস্তাভ লে বঁ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অব দ্য পপুলার মাইন্ড’-এ জনতাত্ত্বিক মনস্তত্ত্বের এক বিশেষ দিক উন্মোচন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, জনতার ভিড়ে ব্যক্তি তার নিজস্ব যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলে এবং সমষ্টিগত আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডিইন্ডিভিডুয়েশন থিওরি’ বা ব্যক্তিসত্তা লোপ। এর ফলে একজন মানুষ একা থাকলে যা করার সাহস পেত না, জনতার অংশ হিসেবে সে অনায়াসেই তা করে ফেলে। এর পেছনে তিনটি প্রধান অনুষঙ্গ কাজ করে—নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় হারিয়ে ফেলা, যুক্তি ছাপিয়ে আবেগের প্রাধান্য পাওয়া এবং সমষ্টিগত কাজের দায়ভার ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনুভব না করা। লে বঁ-এর এই ধারণা, ফ্যাসিবাদী ও গণতান্ত্রিক উভয় আন্দোলনেই ব্যবহৃত হয়েছে।
আমাদের সমাজে এই মব–সংস্কৃতির শিকড় অনেক গভীরে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত জনতার খাদ্যগুদাম আক্রমণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ের সামাজিক অস্থিরতা—সবখানেই জনতার এই স্বতঃস্ফূর্ত অথচ ধ্বংসাত্মক আচরণের প্রমাণ পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০১৯ সালে ‘ছেলেধরা’ গুজবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা এর চরম উদাহরণ। এছাড়া, চোর সন্দেহে নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা বা আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে নিজ হাতে বিচার করার প্রবণতা আমাদের বিচারব্যবস্থার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজবের ওপর ভিত্তি করে হঠাৎ কোনো ব্যক্তি বা স্থাপনার ওপর চড়াও হওয়া এখন প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় মানুষ ভাঙচুর, আক্রমণ বা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। এ রকম উদাহরণ আছে অজস্র—জনতা গুজব শুনে কাউকে চোর বা ছিনতাইকারী ভেবে পিটিয়ে হত্যা করে; রাজনৈতিক মিছিলে আবেগে ভেসে গিয়ে গাড়ি বা দোকান ভাঙে; খেলার মাঠে দর্শকেরা হঠাৎ সহিংস হয়ে ওঠে। বিচারহীনতা ও দুর্নীতি জনতাকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে মবকে আরও দ্রুত সংগঠিত করে।
মব–সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার পার্থক্য রেখাটি অত্যন্ত সরু। রাজনৈতিক সংঘর্ষে দলীয় পতাকা, স্লোগান ও সুনির্দিষ্ট নেতৃত্ব থাকে, যা অনেকটা সংগঠিত রূপ নেয়। কিন্তু মব–সন্ত্রাসের প্রধান চালিকাশক্তি হলো তাৎক্ষণিক উত্তেজনা ও আবেগ। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই আবেগকে উসকে দিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। যেমন, সম্প্রতি কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে বইয়ের দোকানে হামলা বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মব–সন্ত্রাসেরই বহিঃপ্রকাশ। শহর ও গ্রামে একইভাবে এই সংস্কৃতি বিদ্যমান।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে ‘প্রেশার গ্রুপ’ বা চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ধারণাকে মব–সংস্কৃতির পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টা দেখা গেছে। তবে প্রেশার গ্রুপ ও মব–ভায়োলেন্স এক নয়। প্রেশার গ্রুপ সংগঠিতভাবে দাবির পক্ষে কাজ করে, আর মব–সংস্কৃতি হলো নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা, যা কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। প্রেশার গ্রুপের আন্দোলন যখন আবেগের চোরাবালিতে হারিয়ে যায়, তখনই তা মব–সন্ত্রাসে রূপান্তর ঘটে।
এই ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু আইন দিয়ে হবে না, বরং এর মূলে থাকা বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে। শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার মাধ্যমে যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের কোনো বিকল্প নেই। জনতার শক্তিকে যদি সঠিক পথে পরিচালনা করা না যায়, তবে তা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে। এটি একই সঙ্গে আমাদের সমাজের ক্ষত ও ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।



