সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় ধাহরান শহরে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীরা। ঘটনার পর মঙ্গলবার গভীর রাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ। এতে সীমিত পরিসরে আগুন লাগলেও কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বলে বুধবার নিশ্চিত করেছে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়। সংঘাত তীব্র হওয়ার ধারাবাহিকতায় এই ঘটনা ঘটল। ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ গুরুত্ব বেড়েছে।
এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে আরামকোর একটি সূত্র জানায়, ধাহরানে কোম্পানির সদর দপ্তর কমপ্লেক্সের একটি অফিস টাওয়ারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এর প্রভাবে ভবনের ওপরের তিনটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আগুন ধরে যায় বলে সূত্রটি ও অন্য দুই তথ্যদাতা নিশ্চিত করেন। হামলার সময় ওই কমপ্লেক্সের আশপাশে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানান স্থানীয় অন্তত ছয়জন। ধাহরান কমপ্লেক্সটি আরামকোর পুরো তেল অবকাঠামো, শোধনাগার ও রপ্তানি টার্মিনাল তদারকির গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখান থেকে কোম্পানিটির বিশাল তেল অবকাঠামো নেটওয়ার্ক তদারক করা হয়।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, ধাহরানের আকাশে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হলে সেটির ধ্বংসাবশেষ আবাসিক এলাকায় গিয়ে পড়ে। অন্যদিকে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, রাজধানী রিয়াদ এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলের আকাশে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। রিয়াদে হুতিদের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের পর তার অংশবিশেষ পড়ে ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুই নারী, এক পুরুষ ও এক শিশুসহ মোট চারজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুজন নারী, একজন পুরুষ ও একটি শিশু রয়েছে।
ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধে সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার জবাবেই সপ্তাহজুড়ে কৌশলগত স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে হুতিরা। রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও চারবার হামলা হয়েছে, যার মধ্যে গত শনিবারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত হন। দেশটিতে গত এক দশকে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। পরোক্ষভাবে বিমান চলাচলেও ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়।
সানায় জোটের হামলার জবাবে ‘কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক’ পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সতর্ক করেছিলেন যে ধাহরানের আরামকো সদর দপ্তর ও রিয়াদের শোধনাগার তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। পাশাপাশি তেল শিল্পে কর্মরতদের বিপজ্জনক স্থান থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর আগে হুতিরা অভিযোগ তোলে, সৌদি আরব সানা শহরের উপকণ্ঠে ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির সাবাহ কেন্দ্রীয় জ্বালানি ডিপোতে হামলা চালিয়েছে, যা হুতিদের পরিচালিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। সৌদি আরবে তেলশিল্পে কর্মরত ব্যক্তিদেরও সতর্ক করেছে হুতিরা। জোটের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, ইয়েমেন ও আন্তর্জাতিক নৌপথের জন্য হুতিদের হুমকি মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা ‘নিষ্ক্রিয়’ করাই ছিল এ অভিযানের লক্ষ্য। গত মাসে হুতিরা আকস্মিকভাবে যেসব এলাকা দখল করেছিল, সেগুলো পুনরুদ্ধার করাই রিয়াদের এই অভিযানের লক্ষ্য।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেওয়া এক বিবৃতিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সাবাহ ডিপোসহ বেশ কিছু সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় বিমান হামলার কথা স্বীকার করে। জোট জানায়, আন্তর্জাতিক নৌপথ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি নিষ্ক্রিয় করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। এর আগে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সৌদি মন্ত্রিসভার বৈঠকে হুতিদের সতর্ক করে বলা হয়েছিল যে ধারাবাহিক হামলার কারণে তাদের কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ইয়েমেন সরকারের সমর্থনে লোহিত সাগরের বাব আল মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে সৌদি আরব সামরিক অভিযান জোরদার করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হওয়া বৃহত্তর সংঘাতের অংশ হিসেবেই ইয়েমেন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বাব আল মান্দেব বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ওয়াশিংটন এখনো সরাসরি রিয়াদের এই যুদ্ধে জড়াতে রাজি হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রোববার হুতিদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন, যা সোমবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে।



