নেত্রকোনায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান হত্যার ঘটনায় তদন্ত শুরু

, বাংলাদেশ

নেত্রকোনায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান হত্যার ঘটনায় তদন্ত শুরু

সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির গত বৃহস্পতিবার রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয়েছেন। ঘটনার সময় তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে গিয়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি রূপসী বাংলা নামক আইপিটিভি চ্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন এবং ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে তিনি বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে কাজ করতেন। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারান লুৎফুজ্জামান। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন।

নিহতের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা জানান, ঘটনার দিন রাত পৌনে আটটার দিকে দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ানকে তাঁর কোলে দিয়ে লুৎফুজ্জামান কাজে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। ভাত খাওয়ানোর সময় গুলির শব্দ পেয়ে তিনি প্রথমে পটকা ফাটানোর কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই স্বামীর মৃত্যুর খবর পান। তিনি আরও জানান, লুৎফুজ্জামানের সাথে চার বছর বয়সী কন্যা প্রান্তিও রয়েছে। স্বামী হারানোর শোকে ভেঙে পড়া আনন্দিতা এখন হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছেন। ‘বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। কে জানত, সেটিই হবে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর শেষ কথা। রাতের খাবার খেয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন স্ত্রী। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌনে আটটার দিকে দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ানকে স্ত্রীর কোলে দিয়ে বাড়ি থেকে বের হন লুৎফুজ্জামান (৪৪)। স্বামীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন আনন্দিতা। ছেলেকে কোলে নিয়ে স্বামীর মরদেহের পাশে বসে কেঁদে কেঁদে তিনি বলেন, ‘এভাবে যে একজন মানুষকে কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলি করে মেরে ফেলবে, তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পেয়ে প্রথমে ভাবছিলাম কেউ হয়তো ফটকা (পটকা) ফুটাচ্ছে। দোকানটি থেকে লুৎফুজ্জামানের শ্বশুরবাড়িটি প্রায় ২০ গজ দূরে। লুৎফুজ্জামানের ফুফুশাশুড়ি নিরালা রেমা ও রুলি রেমা জানান, তাঁরা তখন ঘরের বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট আওয়াজ শুনে দোকানের কাছে গিয়ে দেখেন লুৎফুজ্জামানের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে রয়েছে। চা খেয়ে বিরিশিরি উতরাইল বাজারের উদ্দেশে বের হন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী দোকানি রবিন রাংসা জানান, লুৎফুজ্জামান চা খাওয়ার পর বের হওয়ার সময় মুঠোফোন ফেলে যাওয়ায় পুনরায় ফিরে এসেছিলেন। ফোন নিয়ে বের হওয়ার মুহূর্তে ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী দুই যুবক দোকানে এসে সিগারেট চেয়ে তাঁকে লক্ষ্য করে পরপর চারটি গুলি ছোড়ে। এরপর স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে হামলাকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পরই গ্রামের একটি দোকানের সামনে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনেরা কান্নাকাটি করছেন। তাঁর মাথা গলা ও বুক থেকে রক্ত ঝরছে। স্বজনদের বরাতে জানা যায়, প্রায় ছয় বছর আগে তেলনজিয়া গ্রামের শিলা সাংমা ও প্রয়াত ফিলিপ রাংসার মেয়ে আনন্দিতাকে বিয়ে করেন লুৎফুজ্জামান। নিজের মুঠোফোন দোকানে ফেলে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে মিনিট তিনেকের মধ্যে আবার ফিরে আসেন।

পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের একটি গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পরপরই জেলার সকল থানায় সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে এবং চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি শুরু হয়েছে। তদন্তকারী একাধিক দল সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

লুৎফুজ্জামানের পৈতৃক নিবাস কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে হলেও তিনি তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় লুৎফুজ্জামানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে জখম করেছিল। তেলনজিয়া গ্রামে অধিকাংশ গারো সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস।

বৃহস্পতিবারের এই ঘটনার পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার শাকের আহমদ খান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাত। তবে যারা তাঁকে হত্যা করেছে, আমার অবুঝ দুটি শিশুকে পিতৃহারা করেছে, পুলিশ তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনুক।