বিএনপি’র অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনে ‘ক্লিন ইমেজের’ নেতৃত্ব খুঁজছে হাইকমান্ড

, বাংলাদেশ

বিএনপি’র অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনে ‘ক্লিন ইমেজের’ নেতৃত্ব খুঁজছে হাইকমান্ড

দুই দশক পর ক্ষমতার মসনদে বসার পরপরই বিএনপিতে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল এবং ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্ব পরিবর্তন করে নতুন কমিটি গঠনের আভাস দিয়েছে দলের হাইকমান্ড। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে। এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে, যেখানে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এবং স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করেছেন। নির্বাচিতদের প্রায় সবাই সংসদ সদস্য হিসেবে বিজয়ী হওয়ায় দলে নতুন মুখ আনার বিষয়টি জোরালো হয়েছে।

ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া চলছে। শীর্ষ নেতাদের ডেকে বিএনপি প্রধান নতুন কমিটি গঠনের বার্তা দেয়ার পর ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির ফেসবুকে পোস্টের মাধ্যমে দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে সেই ঘোষণার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো নতুন কমিটি ঘোষণা হয়নি। বর্তমানে সংগঠনগুলোর ভেতর নতুন কমিটি নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা চলছে। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি সম্প্রতি ভেঙে দেয়া হয়েছে এবং শিগগিরই নতুন কমিটি আসবে বলে জানা গেছে। মূলত স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বা ‘ক্লিন ইমেজ’ বজায় রাখা নেতাদের খুঁজে বের করার প্রক্রিয়ার কারণেই কমিটি ঘোষণায় বিলম্ব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত ৫ই আগস্টের পর থেকে দলের অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতার বিরুদ্ধে সারা দেশে চাঁদাবাজি ও দখলের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় ইতিমধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। তাই নতুন কমিটিতে তরুণ, মেধাবী এবং যাদের বিরুদ্ধে কোনো বিতর্ক নেই, এমন নেতাদের মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাইকমান্ড। সেই সাথে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা সক্রিয় ও পরীক্ষিত ছিলেন, তাদেরও অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রাখতে বিএনপি কোনো তাড়াহুড়ো না করে ধীরে-সুস্থে নেতৃত্ব বাছাইয়ের কাজ চালাচ্ছে। একইসঙ্গে দখল, চাঁজাবাজি এবং বিতর্কিতরা কমিটিতে জায়গা পাবেন না বলেও সূত্রটি জানায়। পাশাপাশি আন্দোলন-সংগ্রামী রাজপথে থাকা নেতাদেরও মূল্যায়ন করা হবে।

অন্যদিকে, জাতীয় কাউন্সিল নিয়েও নেতাকর্মীদের আগ্রহের শেষ নেই। চলতি বছর ডিসেম্বরে সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তা চলতি বছর হচ্ছে না। তবে আগামী বছরের জানুয়ারিতে এটি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলের স্থায়ী কমিটির সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে শূন্য পদ পূরণের সিদ্ধান্ত হলেও কাউন্সিল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। যদিও তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা কমাবে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, কাউন্সিলের তারিখ এখনো নির্ধারিত না হলেও দ্রুতই সেটি ঘোষণা করা হবে। এর আগে ২০১৬ সালের ১৯শে মার্চ সর্বশেষ ষষ্ঠ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার কাউন্সিলকে কেন্দ্র থেকে নেতৃত্ব চাপিয়ে দেয়ার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসবে দলটি। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কাউন্সিলের উদ্বোধন করেছিলেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হামলা-মামলায় তা সম্ভব হয়নি।

কমিটি গঠনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের সাংগঠনিক অভিভাবক এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর এস এম জিলানীকে সভাপতি ও রাজীব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের আংশিক কমিটি হয়েছিল। একইভাবে ২০২১ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর হাসান জাফির তুহিন ও শহিদুল ইসলাম বাবুলকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এছাড়া ছাত্রদলের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের ১লা মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দিন নাছিরকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়, যার মেয়াদ গত ১লা মার্চ শেষ হয়েছে। নাছির উদ্দিন নাছির জানান, দলের চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখনই চাইবেন, তখনই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। এখন পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে এবং তারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে নিজেদের ত্যাগ ও সাংগঠনিক দক্ষতার কথা তুলে ধরছেন। আমরা আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই হবে।