নিয়োগপ্রাপ্ত চালক আড্ডায়

, বাংলাদেশ

নিয়োগপ্রাপ্ত চালক আড্ডায়

গত ৪ অক্টোবর রাত প্রায় পৌনে একটার দিকে সায়েদাবাদের পৌর ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) একটি ময়লার গাড়ি। গাড়ির চালকের আসনে বসা ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। করপোরেশনের নথিপত্রে গাড়িটি ভারী যান চালক সরদার হুমায়ুন কবিরের নামে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে গাড়িটি চালাচ্ছিলেন সাজু আহমেদ নামের এক যুবক। তিনি ডিএসসিসির কোনো নিয়োজিত কর্মচারী নন; বরং মাসে মাত্র ১০ হাজার টাকা চুক্তিতে সহকারীর কাজ করেন। ভারী গাড়ি চালিয়ে পাম্পে আসলেও সাজুর দাবি ছিল, তাঁর কেবল হালকা গাড়ি চালানোর লাইসেন্স আছে। পরে প্রকৃত চালকের বিষয়ে জানতে চাইলে সাজু প্রথমে জানান চালক আশপাশেই আছেন, তবে পরবর্তীতে স্বীকার করেন তাঁর চাচা (মূল চালক) গোলাপবাগ মোড়ে আড্ডামেলায় ব্যস্ত রয়েছেন। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে তিনি তেল না নিয়েই সেখান থেকে গাড়ি সরাতে বাধ্য হন। করপোরেশনের নিজস্ব এই পাম্প থেকে সংস্থাটির গাড়িগুলো জ্বালানি নেয়। বাইরের গাড়িও এখান থেকে তেল কিনতে পারে। রাত পৌনে একটার দিকে আসে ১১-৪৩০৩ নম্বরের গাড়িটি। সাজু চলে যাওয়ার পর পাম্পের কর্মকর্তা ও স্থানীয় কয়েকজন এগিয়ে এসে জানতে চান, কী নিয়ে কাজ করছি। পাম্পে দাঁড়িয়েই গাড়িটির দায়িত্বপ্রাপ্ত চালক সরদার হুমায়ন কবিরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করি। পদ্মা সেতুর দিকে যাওয়া রেললাইনের কাছের এ জায়গায় আগে ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক ছিল। অন্তত ৩৫ জন চালক জড়ো হয়ে আমার কাছে জানতে চান, কী নিয়ে কাজ করছি। একপর্যায়ে করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় ফিরে আসি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাম্পে কর্মরত একজন কর্মকর্তা বলেন, করপোরেশনের চালকদের কিছুটা কম দামে তেল বিক্রির বিষয়টি সবাই জানেন। পাম্পের লোকেরা কাগজে হিসাব লিখে রাখেন। অর্থাৎ নথির চালকের কাছ থেকে গাড়ির চাবি একাধিক হাত ঘুরে পৌঁছায় লাইসেন্সবিহীন ব্যক্তির কাছে।

অন্যের হাতে ময়লার গাড়ি ও চালক সংকট

ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্জ্য পরিবহনের গাড়ি নিয়ে পরিচালিত অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিয়োজিত চালকরা নিজেরা না চালিয়ে অন্তত ২২টি গাড়ি বহিরাগত বা অপেশাদার ব্যক্তিদের দিয়ে চালাচ্ছেন। তবে সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, বাস্তবে এভাবে বেআইনিভাবে চালানো গাড়ির সংখ্যা অন্তত ৫৬টি। পরদিন ৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পাশে করপোরেশনের গ্যারেজে অনুসন্ধানে গেলে সেখানেও একই অনিয়ম চোখে পড়ে। মূল চালকের বদলে অন্যরা গাড়ি চালাচ্ছেন—এমন দুটি গাড়ি নিয়ে তথ্য যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর অন্য চালকদের কাছে সাংবাদিকদের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে সাময়িকভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ রাখে তারা। এছাড়া ৪ অক্টোবর রাত ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত সায়েদাবাদ টার্মিনালের এক পাশে ঢাকা মেট্রো-শ-১১-৪২৭৮ নম্বরের একটি ময়লার গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল, যার মূল চালকের কোনো খোঁজ মেলেনি। সরেজমিনে প্রায় দুই ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করেও মূল চালকদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকের উপস্থিতির খবরও জানিয়ে দিলেন অন্য চালকদের। তাঁর ভাষায়, ‘একদম যে ভালো, আমি এটা বলব না। তবে ১১-৪২৭০ ও ১১-৪৩০৭ নম্বরের গাড়ি দুটি বের হচ্ছিল না। বিভিন্ন বিভাগে জনবলের প্রয়োজন জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

ডিএসসিসির মোট যান ও যন্ত্রপাতির (যার মধ্যে এক্সক্যাভেটর, রোড রোলার ও বুলডোজার অন্তর্ভুক্ত) সংখ্যা ৬০৮টি। কিন্তু এর বিপরীতে সংস্থাটির স্থায়ী চালক রয়েছেন মাত্র ২৫২ জন। স্থায়ী চালকের এই সংখ্যার তথ্য নিশ্চিত করেছেন ডিএসসিসি পরিবহন চালক শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি শাহ আলম তালুকদার। তিনি জানান, সংস্থায় নিয়োজিত অন্য পদের কর্মী, যাঁদের চালক হিসেবে দক্ষতা ও লাইসেন্স রয়েছে, তাঁদের মধ্য থেকেও অনেকে পরিচ্ছন্নতা চালক হিসেবে গাড়ি চালান। চালক সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু চালক নিয়োগ দিয়েছেন এবং সামনে আরও জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, চাকরি করেন, বেতন পান এবং সেই আয়েই চলেন।

জ্বালানি বণ্টন ও ভাগাভাগির অভিযোগ

ময়লার গাড়ি হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বরাদ্দের সরকারি জ্বালানি আত্মসাতের অভিযোগ। ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের বাসাবাড়ির ময়লা প্রথমে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস)-এ জড়ো করা হয় এবং সেখান থেকে ৩, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ টন ধারণক্ষমতার গাড়িগুলোর মাধ্যমে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে নেওয়া হয়। প্রতি রাতে এসব গাড়ি গড়ে ৩ থেকে ৪ বার যাতায়াত করে। গাড়ি এবং যাত্রাপথ ভেদে প্রতি ট্রিপের জন্য ৮ থেকে ১৪ লিটার জ্বালানি বরাদ্দ থাকে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ট্রিপে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ লিটার করে তেল কম তুলে বাকি লিটারের সমপরিমাণ টাকা আত্মসাৎ ও ভাগাভাগি করা হয়। বরাদ্দের পুরো তেল গাড়িতে না তুলে বাকি অংশ কম দামে পাম্পেই বিক্রি করে দেওয়া হয়।

পৌর ফিলিং স্টেশনের স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, যেমন ১২ লিটার বরাদ্দ থাকলে চালক ৮ বা ৯ লিটার তেল নেন এবং বাকি তেলের মূল্যের টাকা নগদ বুঝে নেন। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫ হাজার ৮৪২টি ট্রিপ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি ট্রিপে ৩ লিটার তেল কম নেওয়া হলে মাসে মোট আত্মসাৎকৃত তেলের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫২৬ লিটার। অক্টোবর মাসের সরকারি মূল্য অনুযায়ী যার আনুমানিক অর্থ দাঁড়ায় প্রায় ২১-২২ লাখ টাকা। এই অর্থের ভাগ কিছু চালক, ইউনিয়ন নেতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পকেটে যায় বলে অভিযোগ উঠলেও তা অস্বীকার করেছেন ইউনিয়ন সভাপতি শাহ আলম তালুকদার। ট্রেড ইউনিয়ন ও চালকদের তদারকি সম্পর্কে প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার খর্ব করা সম্ভব নয়, তবে কোনো অনিয়ম নির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অক্টোবরের সরকারি খুচরা মূল্য প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা ধরে এই ডিজেলের বাজারমূল্য ২৩ লাখ ৬৬ হাজার ১০ টাকা। একই হারে এক বছর চললে এবং দাম অপরিবর্তিত থাকলে তা প্রায় ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির দীর্ঘ ইতিহাস

অদক্ষ ও অপেশাদার চালকদের হাতে ময়লার গাড়ি তুলে দেওয়ার ফলে ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্যবাহী গাড়ির ধাক্কায় অন্তত ১৫টি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে বাসাবোয় ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনায় মারা যান আরও ২ জন। ফলে সব মিলিয়ে ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৬টি পৃথক দুর্ঘটনায় মোট ১৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। তবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, চালকেরা দিন–রাত মিলিয়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালান। তবে লোক বাড়ানোর সঙ্গে বেতন দেওয়ার সামর্থ্যের বিষয়টিও দেখতে হচ্ছে।

২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে রাস্তা পার হওয়ার সময় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির চাপায় নিহত হন। তদন্তে বেরিয়ে আসে, মূল বরাদ্দপ্রাপ্ত চালক ইরান মিয়ার বদলে গাড়িটি দেওয়া হয়েছিল হারুন নামের একজনকে, যিনি আবার তা চালাতে দিয়েছিলেন রাসেল নামের এক বহিরাগত পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে। নাঈম হাসানের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে নগর ভবন ঘেরাও করেন। এরপর তৎকালীন মেয়রসহ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত ও চালক বরখাস্তের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মূল সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলন, নগর ভবন ঘেরাও, তদন্ত কমিটির গঠন কিংবা চালক বরখাস্তের পরও অন্যের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়ার এই চরম অনিয়ম বন্ধ হয়নি। পরবর্তীতে স্কুলছাত্র মাহিন আহমেদ এবং লন্ড্রির দোকান কর্মী ইকবাল হোসেনের প্রাণহানির ক্ষেত্রেও তদন্তকালে হুবহু একই ধরনের অনিয়ম ও চালক বদলের তথ্য পাওয়া গেছে। খিলগাঁওয়ে ডিএসসিসির ময়লার গাড়িচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত।

কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

ময়লার গাড়ির চালকদের মাধ্যমে সংঘটিত এসব বেআইনি কার্যকলাপ ও অনিয়মের কথা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি ডিএসসিসির পরিবহন চালক শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি শাহ আলম তালুকদার। তিনি স্বীকার করেন যে জরুরি প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে নিয়োজিত চালকের বদলে অন্যদের গাড়ি চালাতে দেওয়া হয়। পরিবহন পুল থেকে সেটি দেওয়া হয় হারুনকে।

অন্যদিকে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানান, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে একজন মানুষের মৃত্যুও অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, সায়েদাবাদ বা ফিলিং স্টেশনের নির্দিষ্ট কোনো গাড়ির ক্ষেত্রে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রদান করা হলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদারকিতে থাকা কর্মকর্তাদের অবহেলার প্রশ্নে তিনি জানান, লিখিত বা প্রত্যক্ষ কোনো অভিযোগ না পেলে ঢালাওভাবে কাউকেই অভিযুক্ত করা যায় না, তবে দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা যদি এ ধরনের অনিয়ম দেখেও নীরব থাকেন বা প্রশ্রয় দেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিশেষজ্ঞের মতামত

দক্ষিণ সিটির এই দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ಹಾಗೂ পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামছুল হক জানান, সিটি করপোরেশনের প্রশাসকেরা বর্তমানে বিভিন্ন প্রশংসনীয় ও সাহসী পদক্ষেপ নিলেও এই ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি আরও যোগ করেন, ময়লার গাড়ির চাপায় প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের যে মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটছে, তার জন্য কেবল সরাসরি গাড়ির ড্রাইভারকে এককভাবে দায়ী করলে চলবে না। সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও তদারকির চরম ব্যর্থতার কারণে মূল দায়ভার ঢাকা সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে।